ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য—দুই সূচকেই পতন হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানির মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে। আমদানির পরিমাণও কমেছে ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। একই সময়ে পোশাকের গড় আমদানিমূল্য প্রতি কেজিতে কমেছে ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অর্থাৎ চলতি বছরে ইউরোপের পোশাক বাজারে চাহিদার চাপ তৈরি হয়েছে। শুধু আমদানির পরিমাণ কমেনি, ক্রেতারা আগের তুলনায় কম দামে পোশাক কেনার দিকেও ঝুঁকেছেন। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন পোশাক রপ্তানিকারক দেশের ওপর। তবে সামগ্রিক বাজার সংকোচনের তুলনায় বাংলাদেশের পতন আরও বেশি।
তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সাত মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে। পরিমাণের হিসাবে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে রপ্তানি করা পোশাকের গড় দাম প্রতি কেজিতে কমেছে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
এর ফলে ইউরোপের তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বও কমেছে। বিশেষ করে মূল্য ও পরিমাণ—দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। ইউরোপে পোশাক সরবরাহকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই সবচেয়ে কম দামে পোশাক সরবরাহ করছে বলে তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, একই সময়ে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর কয়েকটি তুলনামূলক ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমলেও চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি মূল্য বেড়েছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউতে চীনের পোশাক রপ্তানির মূল্য ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে।
শুধু রপ্তানি মূল্য নয়, পোশাকের গড় দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া এগিয়ে রয়েছে। আলোচ্য সময়ে ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্য প্রতি কেজিতে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। একদিকে ইউরোপীয় বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমে যাওয়ায় অর্ডারের পরিবেশ কঠিন হয়েছে, অন্যদিকে প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ নিজেদের রপ্তানি ধরে রাখতে বা বাড়াতে পারছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাকের গড় মূল্য কমে যাওয়ায় রপ্তানি আয় ও মূল্য সংযোজনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, চলতি বছরে সামগ্রিকভাবে ইউরোপে পোশাক আমদানি কমেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। তবে গত দুই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক মন্দা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি বাড়াতে পেরেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা এখন পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তাই এই বাজারে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গড় রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়া এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার বিষয়টি শিল্পসংশ্লিষ্টদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।


