দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় নাম
১৮ সেপ্টেম্বর—শহীদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের জন্মদিন। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই সাহসী নৌসেনা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদকে। যাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন এমন এক দেশপ্রেমিক, যিনি পেশাগত জীবনে পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন দক্ষ কর্মকর্তা হয়েও বাঙালির অধিকার, আত্মমর্যাদা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। তাঁর জীবনকাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশের প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে এমন এক আত্মত্যাগের পথে নিয়ে যায়, যার মূল্য দিতে হয় নিজের জীবন দিয়ে।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
শহীদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ১৯৩৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পিরোজপুর জেলার ডুমুরিতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোফাজ্জেল আলী ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা লতিফুন্নেছা বেগম।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মমর্যাদাবোধে উজ্জীবিত। ১৯৪৭ সালে বাগেরহাটের কচুয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে বাগেরহাট কলেজে ভর্তি হন। পরে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন কলেজে আইএসসি শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ১৯৫০ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেন।
একই বছর ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে মেকানিক্যাল ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে তিনি নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৭ সালে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদে উন্নীত হন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: এক দুঃসাহসী অধ্যায়ের সূচনা
পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, অধিকারহীনতা ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ক্রমেই দৃঢ় হয়ে ওঠে। দেশের স্বাধীনতা ও বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তিনি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন।
১৯৬৭ সালের ৯ ডিসেম্বর সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ নামে যে মামলা দায়ের করে, ইতিহাসে তা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত।
এই মামলার ৩৫ জন অভিযুক্তের তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম আসামি এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন দ্বিতীয় আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার লক্ষ্যে নৌবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের সংগঠিত করা এবং অন্যান্য সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলনের পরিকল্পনা করা।
আগরতলা মামলা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মামলাটিকে কেন্দ্র করে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন আরও ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৬৯ সালের প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। মুক্তি পান বঙ্গবন্ধুসহ সব অভিযুক্ত।
মুক্তি লাভের পর মোয়াজ্জেম হোসেন পুনরায় নৌবাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পেশাগত জীবনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
স্বাধীনতার স্বপ্নে অবিচল
১৯৭০ সালের ১৮ মার্চ তিনি নৌবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর তাঁর কাছে ছিল না নিষ্ক্রিয়তার নাম। বরং জীবনের নতুন অধ্যায়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন।
১৯৭০ সালের ২৪ মার্চ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। ২৮ মার্চ গঠন করেন ‘লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি’। পরবর্তী সময়ে এই কমিটিকে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করেন।
১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের নির্দেশ দেন এবং বিভিন্ন জেলায় জনমত সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন।
দেশ যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে, তখন তাঁর চিন্তা ও কর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাঙালির মুক্তি, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা।
২৫ মার্চের কালরাত্রি ও শহীদ মোয়াজ্জেম হোসেন
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সামরিক শক্তি দিয়ে দমন করার এই অভিযানের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ঢাকায়।
২৬ মার্চ সকালে কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ঢাকায় তাঁর বাসভবনে প্রবেশ করে এবং তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।
এভাবেই স্বাধীনতার সূচনালগ্নে প্রাণ দিতে হয় আগরতলা মামলার এই সাহসী অভিযুক্তকে, যিনি একসময় পাকিস্তান নৌবাহিনীরই একজন কর্মকর্তা ছিলেন। স্বাধীনতার জন্য তাঁর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের পরিণতি হয়েছিল এক মর্মান্তিক শহীদত্বে।
তাঁর মৃত্যু কেবল একজন মানুষের জীবনাবসান ছিল না; তা ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় নিবেদিত এক দেশপ্রেমিকের আত্মত্যাগের মর্মান্তিক পরিণতি।
স্মৃতিতে অম্লান
শহীদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে ১৯৭৬ সালের ১৬ জানুয়ারি রাঙামাটিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটির নামকরণ করা হয় ‘বিএনএস শহীদ মোয়াজ্জেম’।
১৯৯৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁর নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ঢাকায় তাঁর নামে একটি সড়কেরও নামকরণ করা হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত খল অভিনেতা রাজের বড় ভাই। তবে ইতিহাসে তাঁর পরিচয় কোনো পারিবারিক পরিচয়ের সীমায় আবদ্ধ নয়। তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন একজন সাহসী নৌসেনা, স্বাধীনতাকামী সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদ হিসেবে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
দেশের স্বাধীনতা, মানুষের মুক্তি ও বাঙালির আত্মমর্যাদার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, শহীদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁদেরই একজন।
পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা থেকে স্বাধীনতার স্বপ্নে নিবেদিত এক সংগ্রামী দেশপ্রেমিক—তাঁর জীবন আমাদের ইতিহাসের এক গৌরবময় ও বেদনাবিধুর অধ্যায়।
তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাঁর স্মৃতি বেঁচে থাকুক স্বাধীনতার চেতনায়, দেশপ্রেমের প্রেরণায় এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়।
শহীদ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।


