খুলনা নগরীর হরিণটানা এলাকায় মেসে খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। নিহত মো. আজমল হোসেন (২২) বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, সামান্য খাবারের বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁকে মারধর করা হয় এবং পরে পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশও ঘটনাটি তদন্ত করে মারধরের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
নিহত আজমল চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এলাকার বড় সলুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মো. কুতুব উদ্দিন। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরোডসংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি মেসে এ ঘটনা ঘটে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে হাসপাতাল নেওয়ার পর রাত দেড়টা থেকে আড়াইটার মধ্যে তাঁর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আজমল যে মেসে থাকতেন সেখানে খাবারের জন্য আগে থেকে মিল নিশ্চিত করার নিয়ম ছিল। ঘটনার রাতে তিনি কাউকে না জানিয়ে অন্য একজনের জন্য রাখা ভাত খেয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে মেসের কয়েকজন সদস্য তাঁর সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন।
পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে বিষয়টি খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আজমলের বিরুদ্ধে টাকা চুরি এবং পরে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগও তোলা হয়। তাঁকে ভবনের ছাদে নিয়ে মারধর করা হয় এবং তাঁর মাথার চুল কেটে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর কোনো একপর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। স্থানীয় ও হাসপাতাল সূত্রে তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন থাকার কথাও উঠে এসেছে।
তবে আজমল কীভাবে ছাদ থেকে নিচে পড়েছিলেন, সেটি এখনও তদন্তসাপেক্ষ। তাঁকে মারধরের পর ফেলে দেওয়া হয়েছিল, নাকি মারধরের একপর্যায়ে তিনি নিজেই পড়ে যান—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তসহ তদন্তের অন্যান্য তথ্য পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বাবার কাছে টাকা দাবি
নিহতের বাবা জানান, ঘটনার রাতে প্রায় ৯টার দিকে আজমল তাঁকে ফোন করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, কাউকে না জানিয়ে ভাত খাওয়ার কারণে তাঁর সঙ্গে বিরোধ হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে টাকা চুরির অভিযোগও তোলা হচ্ছে। পরে মেসের কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
আজমলের পরিবারের ভাষ্য, তাঁরা বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে ছেলেকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
মেসে রান্না ও খাবার পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত এক নারী জানান, তিনি নিয়মিত রান্না করে মেসের সদস্যদের খাবার দিয়ে আসতেন। ঘটনার দিন আজমল আগে থেকে না জানিয়েই খাবার খেয়েছিলেন বলে তিনি জানতে পারেন। পরে মেসের অন্য সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন। তবে মারধরের কারণ হিসেবে ভাতের পাশাপাশি টাকা, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগের কথাও তিনি শুনেছেন বলে জানান।
তদন্তে পুলিশের গুরুত্ব
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত করে আজমলকে মারধরের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে মারধরে ব্যবহৃত একটি লাঠিও জব্দ করা হয়েছে।
আজমলের বাবার কাছে ফোন করে টাকা চাওয়ার অভিযোগটিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। ওই ফোনকলের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) চাওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পেছনে প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, তা বের করার চেষ্টা চলছে।
এ ঘটনায় আরও একটি বিষয় তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—আজমলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা তাঁর মৃত্যুর পর দ্রুত সেখান থেকে চলে যান বলে হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের বক্তব্য নেওয়া তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আজমলের মৃত্যুর ঘটনাকে রহস্যজনক বলে উল্লেখ করেছে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কানাই লাল সরকার জানিয়েছেন, আজমল সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তদন্ত-তথ্য হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা না হলেও প্রয়োজন হলে পুলিশ বাদী হয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। খাবার খাওয়ার মতো একটি সাধারণ বিষয় কীভাবে মারধর, চুরির অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গড়াল—এখন তদন্তের মূল বিষয় সেটিই। আজমলের পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।


