চীনা স্যাটেলাইট তথ্য ঘিরে ইরানের হামলার নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ

ইরানের সামরিক হামলায় লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি চীনা গোষ্ঠীগুলোর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি ও ভূ-স্থানিক তথ্য এবং রাশিয়ার কারিগরি সহায়তাও ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ শনাক্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় তুলনামূলক নির্ভুল হামলার ক্ষেত্রে চীনা তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে উচ্চ-রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি তেহরানের হাতে পৌঁছেছিল। ১৭ জুলাইয়ের ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং আরও চারজন আহত হন বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে। তবে এসব তথ্য সরবরাহকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং মার্কিন সরকার এখন পর্যন্ত চীনা সরকারের সরাসরি নির্দেশে ওই সহায়তা দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।

হরমুজ প্রণালিতে নজরদারির নতুন কৌশল

চীনা ভূ-স্থানিক তথ্য ইরানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি। হরমুজ প্রণালির মতো ব্যস্ত ও সংকীর্ণ জলপথে জাহাজের অবস্থান সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা পাওয়া গেলে তুলনামূলক সরল প্রযুক্তির ড্রোন দিয়েও হামলার সময় নির্ধারণ করা সহজ হয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান একাধিক তাপ-অনুসরণকারী ড্রোন একসঙ্গে উৎক্ষেপণ করছে। এসব ড্রোন মাঝপথে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিন্তু জাহাজটি কখন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে আগাম তথ্য থাকলে উপযুক্ত সময়ে ড্রোন উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয়। এরপর ড্রোনগুলো জাহাজের তাপ-স্বাক্ষর অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

এক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, সাম্প্রতিক একটি নৌ-এসকর্ট অভিযানে মার্কিন বাহিনী এক ডজনের বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত এবং প্রায় ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা অভিযান চালানো হয়। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, জলপথটিতে সামরিক তৎপরতা কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে।

শুধু স্যাটেলাইট তথ্য নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তার অভিযোগও

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। চীনা তথ্যের পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের কারিগরি সহায়তায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ধারাবাহিকভাবে সামরিক অভিযান চালানোর অভিজ্ঞতাও ইরানের বাহিনীকে নিজেদের কৌশল পরিমার্জনের সুযোগ দিয়েছে।

অর্থাৎ, ইরানের বর্তমান সক্ষমতাকে কেবল বাইরের সহায়তার ফল হিসেবে দেখছেন না মার্কিন কর্মকর্তারা। তাঁদের মূল্যায়নে দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং বিদেশি সহায়তা—তিনটি বিষয়ই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

চীনের ভূমিকা নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন

তবে চীন ঠিক কতটা এবং কী পর্যায়ে ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চীনা সরকার সরাসরি এসব সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে কি না, নাকি চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগে তথ্য সরবরাহ করেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তারাও সরাসরি বেইজিংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেননি। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া স্যাটেলাইট তথ্য ইরানের হাতে পৌঁছেছিল—কিন্তু এর পেছনে চীনা সরকারের নির্দেশ ছিল কি না, তা আলাদা প্রশ্ন।

চীন অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার কথা জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চীনা সহায়তার অভিযোগকে প্রকাশ্যে গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। তিনি চীনের নজরদারি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে তুলনা টানেন।

ওয়াশিংটনের পাল্টা পদক্ষেপ

ইরানের হাতে চীনা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠানের ছবি পৌঁছানোর অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্রও ব্যবস্থা নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন মে মাসে তিনটি চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, এসব প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ শুধু স্যাটেলাইট ছবি নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের সামরিক সরঞ্জাম পুনর্গঠনে চীন থেকে আসা ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা বেসামরিক ও সামরিক—দুই ধরনের কাজে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ নিয়েও ওয়াশিংটনের নজর রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এই ধরনের সরঞ্জাম সরাসরি অস্ত্র না হলেও সামরিক প্রযুক্তির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরানের সামরিক মজুত পুনর্গঠনের সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ছে।

মার্কিন ঘাঁটিতে বাড়ছে চাপ

ইরানের হামলার ধরনও বদলাচ্ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্য। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য সম্পদকে চাপের মধ্যে রাখাই তেহরানের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তাঁদের মূল্যায়ন।

ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় বিশেষ করে নিচু ও মাঝারি উচ্চতায় আসা লক্ষ্যবস্তু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। উচ্চ-উচ্চতার ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও তুলনামূলক নিচু উচ্চতায় চলা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের প্রয়োজন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে জুলাইয়ের হামলা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার আগে ও পরে পাওয়া স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে ইরানের হামলার যোগসূত্র মার্কিন কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখেছেন। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাটি চীনা স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহারের অভিযোগকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।

পুরোনো হামলার সঙ্গে নতুন সক্ষমতার পার্থক্য

ইরান এর আগেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ২০২০ সালে ইরাকের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল, যা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল।

তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বর্তমান মূল্যায়ন হলো, এরপর ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণ ও আঘাতের নির্ভুলতায় পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে মার্কিন সামরিক স্থাপনার নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাগুলো সেই পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জুলাইয়ে জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলার ক্ষেত্রে চীনা স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

অভিযোগের বাইরে যে বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট

ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে চীনা সহায়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে চীনা স্যাটেলাইট তথ্যের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট হলেও, বেইজিংয়ের সরাসরি নির্দেশে এসব তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে—এমন প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।

চীনা পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, চীনা উৎস থেকে পাওয়া তথ্য অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতার পরিবর্তনের পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। নিজস্ব প্রযুক্তি, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা, রাশিয়া ও চীনের কারিগরি সহযোগিতা এবং চীনা উৎস থেকে পাওয়া ভূ-স্থানিক তথ্য—এসব উপাদান একসঙ্গে কাজ করছে বলে মার্কিন মূল্যায়নগুলোতে উঠে এসেছে।

আর এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপের জায়গাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। জলপথটির নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি—তিন ক্ষেত্রেই ইরানের উন্নত লক্ষ্য নির্ধারণ সক্ষমতা ভবিষ্যৎ সংঘাতের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম এবং বেইজিংয়ের সরকারি নীতির মধ্যে প্রকৃত সম্পর্ক কী, সেটিও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।