সামাজিক অন্যায়, অসঙ্গতি ও মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বরাবরই সংগীতিকে বেছে নিয়েছেন বিশিষ্ট গীতিকবি মাহবুবুল খালিদ। নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মনের কথা সুরে সুরে ফুটিয়ে তোলাকে তিনি নিজের শিল্পচর্চার অন্যতম প্রধান দায় হিসেবে দেখেন। সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসের ধারাবাহিকতায় এবার তাঁর নতুন গানে উঠে এসেছে কুখ্যাত যৌতুক প্রথার ভয়াবহ রূপ, নারীর প্রতি এর অমানবিক সহিংসতা এবং এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বলিষ্ঠ আহ্বান।
‘যৌতুক’ শিরোনামের এই প্রতিবাদী গানটিতে যৌথভাবে কণ্ঠ দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সোমনূর মনির কোনাল এবং তরুণ গায়ক রাফসান। গানটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর কালজীয় সুরসংযোজনা, যা তৈরি করেছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তাঁর তৈরি জাদুকরী সুরের মূর্ছনায় গানটি ভিন্ন মাত্রার আবেগে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
গানের লিরিকে যৌতুককে একটি গভীর ব্যাধি, যন্ত্রণা ও চরম অভিশাপ হিসেবে সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গীতিকার। লোভি মানসিকতার কারণে কীভাবে একটি আনন্দময় ও সুখের সংসার রাতারাতি নরকতুল্য জীবনে রূপ নেয়, নারীর ওপর নেমে আসে পাশবিক নির্যাতন কিংবা অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মতো নারকীয় কালো থাবা—তা অতি নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। তবে কেবল কষ্টের চিত্র এঁকেই ক্ষান্ত হননি গীতিকবি; বরং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুস্পষ্ট বার্তাও দিয়েছেন।
গানের একাংশে উচ্চারণ করা হয়েছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, ‘যৌতুক ব্যাধি যৌতুক যন্ত্রণা/ যৌতুক অভিশাপ/ সইবো না আর যৌতুকের জ্বালা/ যৌতুক অপরাধ।’ এর পাশাপাশি ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সামাজিকভাবে চলে আসা ভেদাভেদ দূর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সন্তানদের কেবল বোঝা মনে না করে উপযুক্ত শিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীলতার শক্তিতে বলীয়ান করে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন রচয়িতা। তাঁর মতে, উপযুক্ত শিক্ষা ও স্বাবলম্বিতাই পারে সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায় প্রতিরোধ করার আসল হাতিয়ার হতে।
গানটি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেয়েছে ‘খালিদ সংগীত’-এর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে। তাছাড়া শ্রোতারা এটি তাঁদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও শুনতে ও দেখতে পাচ্ছেন।
দেশপ্রেম, প্রকৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক পার্বণ, আন্তর্জাতিক খেলাধুলা এবং সমাজ সচেতনতামূলক বিষয়ে মাহবুবুল খালিদের সংগীতভুবন অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশাত্মবোধক গান, গণসংগীত, লোকসংগীত, হামদ-নাত, আধ্যাত্মিক ধারা থেকে শুরু করে শিশুতোষ কিংবা প্রেম-বিরহের গানে তিনি তাঁর প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের নানা আলোচিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনাকে গানের ক্যানভাসে তুলে ধরার ইতিহাস তাঁর বহু পুরোনো। মিরপুরের নির্যাতিত শিশু গৃহকর্মীকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন সাড়াজাগানো গান ‘আদুরি’। আবার সীমান্ত ট্র্যাজেডি নিয়ে তাঁর লেখা ‘ফেলানীরে করল গুলি’ গানটিতে প্রতিবাদের পাশাপাশি ঝরে পড়েছিল গভীর মানবিক বেদনা।
এছাড়া মাগুরার ছোট্ট শিশু আছিয়ার ওপর ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিবাদে তিনি উপহার দেন ‘মাগুরার ফুল’ শিরোনামের মর্মস্পর্শী গানটি। সামাজিক নির্মমতার বিরুদ্ধে এমন অসাধারণ সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ ‘বাইফা অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হন মাহবুবুল খালিদ। সম্প্রতি শিশু রামিসার ওপর অন্যায়ের বিচার চেয়ে তাঁর লেখা ‘রামিসার বিচার’ গানটিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও তাঁর কলম থেকে এসেছে প্রতিবাদী সুর। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের লড়াই কিংবা রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয় নিয়ে তিনি একাধিক গান বেঁধেছেন। পাশাপাশি ক্রিকেট ও ফুটবল বিশ্বকাপ কেন্দ্রিক উদ্দীপনামূলক গান তৈরি করেও কুড়িয়েছেন অগণিত ক্রীড়াপ্রেমীর ভালোবাসা। সামাজিক অসঙ্গতিকে সুরে বেঁধে পরিবর্তনের বার্তা দেওয়ার সেই চিরায়ত চর্চার ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলো সচেতনতামূলক সৃষ্টি ‘যৌতুক’।


