ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে অ্যাথলেট প্রশিক্ষক সাজ্জাদ হোসেনকে হাফপ্যান্ট পরার কারণে হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেছেন কয়েকজন তরুণ। বৃহস্পতিবার সকালে হাফপ্যান্ট বা স্পোর্টস শর্টস পরে মেট্রোরেলে উঠে তারা পোশাকের কারণে যাত্রী হয়রানির অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
‘হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে!’ শিরোনামে আয়োজিত এই কর্মসূচি চলে ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, স্বাভাবিক স্পোর্টসওয়্যার পরার কারণে কোনো যাত্রীকে হয়রানি করা বা গণপরিবহন ব্যবহারে বাধা দেওয়া উচিত নয়। যারা এমন অবস্থানের সঙ্গে একমত, তাদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
কর্মসূচিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ সাড়া পড়ে। আয়োজকদের খোলা ফেসবুক ইভেন্টে বুধবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৬৭২ জন ‘গোয়িং’ এবং প্রায় ৮ হাজার ২০০ জন ‘ইন্টারেস্টেড’ হিসেবে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে ফার্মগেটে আনোয়ারা উদ্যান-সংলগ্ন মেট্রো স্টেশনের নিচে উপস্থিত হন তিন তরুণ। তারা হলেন বেসরকারি চাকরিজীবী ও রানার সাগর মজুমদার, ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান এবং রকিবুল ইসলাম।
সাগর মজুমদার জানান, দৌড়ানোর সময় শর্টস পরা আরামদায়ক হওয়ায় রানারদের মধ্যে এ ধরনের পোশাক ব্যবহার স্বাভাবিক। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অ্যাথলেট প্রশিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন সম্প্রতি শর্টস পরে মেট্রোরেলে উঠতে গিয়ে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা অন্য রানারদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সাগর বলেন, তিনি নিজেও নিয়মিত রান করেন। ফলে কোনো একদিন মেট্রোরেল কিংবা অন্য কোথাও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন বলে তার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে এসেছেন তিনি।
তার বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, পোশাককে কেন্দ্র করে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে দেখা উচিত। তার মতে, শর্টস নিজে কোনো সমস্যা নয়; সেটিকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটিই আলোচনার বিষয়।
সকাল ৭টার পর সাগর ও মাহফুজুর শর্টস পরে মেট্রোরেলে ওঠেন। তারা ফার্মগেট স্টেশনের টিকিট কাউন্টার থেকে বিজয় সরণির টিকিট কাটেন। এরপর টিকিট পাঞ্চ করে প্ল্যাটফর্মে যান এবং মেট্রোরেলে ওঠেন। ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি স্টেশনে নেমে তারা নিজেদের গন্তব্যে চলে যান।
অন্যদিকে রকিবুল তাদের সঙ্গে ট্রেনে ওঠেননি। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচিটির খবর দেখার পর এবং পরিচিত অনেককে এতে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখে প্রতিবাদে অংশ নিতে ফার্মগেটে এসেছিলেন।
সাগর ও মাহফুজুর যখন মেট্রোরেলে ওঠেন, তখন ফার্মগেট স্টেশনের অন্য একটি প্রবেশপথ দিয়ে আরও দুজন তরুণ হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে ওঠেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তাদের পরিচয় জানা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুজন মতিঝিলের টিকিট কেটেছিলেন।
যে ঘটনা ঘিরে প্রতিবাদ
এই কর্মসূচির পেছনে রয়েছে ২৭ সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনা। ওই দিন সকালে শরীরচর্চা শেষ করে টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে যান অ্যাথলেট প্রশিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন। অভিযোগ, ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্য তার পোশাককে ‘অশালীন’ বলে মন্তব্য করেন এবং তাকে টিকিট পাঞ্চ মেশিনের সামনে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে মেট্রোরেলে যাত্রীদের পোশাক নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আছে কি না এবং থাকলে তা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে—এমন প্রশ্ন সামনে আসে।
এই ঘটনার প্রতিবাদেই ফার্মগেট স্টেশনে বৃহস্পতিবারের কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের বক্তব্য, কোনো ধরনের পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ থাকলে তা স্পষ্ট ও লিখিত নিয়মের মাধ্যমে জানানো উচিত। যাত্রীরা যাতে আগে থেকেই জানতে পারেন কোন পোশাক গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নয়, সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।
আয়োজকদের ফেসবুক ইভেন্টের বার্তায় কর্মসূচিটিকে শান্তিপূর্ণ নাগরিক প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেখানে রানিং শর্টস ও টি-শার্ট পরে একসঙ্গে মেট্রোরেলে ওঠার আহ্বান জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বলা হয়েছিল, কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নয়; বরং হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদ, পরিষ্কার নিয়মের দাবি এবং যাত্রীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণের পক্ষে অবস্থান জানানো।
ফলে কয়েকজন তরুণের হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে যাত্রা এখন কেবল একটি প্রতীকী প্রতিবাদের ঘটনা নয়; এটি গণপরিবহনে পোশাক, যাত্রীসেবা এবং নিয়ম প্রয়োগের ধরন নিয়ে নতুন করে জনআলোচনারও জন্ম দিয়েছে।


