মরিয়মের মৃত্যু মামলায় মামা ওবায়দুরের চার দিনের রিমান্ড

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাঁর মামা ওবায়দুর রহমানের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এদিন ওবায়দুরকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁর উপস্থিতিতেই রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মরিয়মের মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মৃত্যুর আগে ও পরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে ওবায়দুরের আইনজীবী গোলাম সাবের চৌধুরী রিমান্ডের বিরোধিতা করেন এবং তাঁর জামিন চান। তিনি আদালতে বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে ইতিমধ্যে দুই দফায় রিমান্ডে নেওয়া হলেও তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে থাকা আর আত্মহত্যায় প্ররোচনার সঙ্গে জড়িত থাকা এক বিষয় নয় বলেও তিনি দাবি করেন।

দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ওবায়দুরের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর মৃত্যুর কারণ ও এর পেছনে কারও ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।

মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে মরিয়মের বিয়ে, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মৃত্যুর আগের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, গত জুনে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিয়ে হয়। গাজী নজরুল সংসদ সদস্য হওয়ায় তিনি মরিয়ম ও প্রথম স্ত্রী মাকসুদাকে নিয়ে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের ওই বাসায় বসবাস করতেন।

মামলার বাদীর অভিযোগ, ওবায়দুরের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে গাজী নজরুল ও মাকসুদা মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

মৃত্যুর আগে বাবাকে বাসায় আসতে বলা হয়

মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। তিনি সেখানে পৌঁছানোর পর দেখতে পান, ফ্ল্যাটে বেশ কয়েকজন মানুষ উপস্থিত রয়েছেন।

পরে তাঁকে জানানো হয়, বাসার একটি কক্ষে মরিয়ম ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছেন। শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সহায়তায় কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয় এবং মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ সময় বিছানার ওপর মরিয়মের লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে বলেও মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই নোটের বিষয়বস্তু এবং মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে বলে মামলার তথ্য থেকে জানা যায়।

এর আগে গাজী নজরুল ও মাকসুদার রিমান্ড

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর ২১ সেপ্টেম্বর মাকসুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ২২ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলামকে দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পরে ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার বাদী মাসুম বিল্লাহ আদালতে উপস্থিত হয়ে আপস-মীমাংসার কথা উল্লেখ করে একটি হলফনামা জমা দেন। তিনি আদালতকে জানান, আসামিরা জামিন পেলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। শুনানি শেষে আদালত মাকসুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেন। তবে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নাকচ করা হয়।

তদন্তে এখন ওবায়দুরকে জিজ্ঞাসাবাদ

ওবায়দুরকে গ্রেপ্তারের পর ২৩ সেপ্টেম্বর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। এরপর মামলার তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।

শেষ পর্যন্ত আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এই সময়ে তদন্তকারীরা মরিয়মের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক, গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর বিয়ের প্রেক্ষাপট এবং মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন।

তবে আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার অর্থ নয়। ওবায়দুরের আইনজীবী তাঁর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মামলায় করা অভিযোগের সত্যতা এবং মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।