স্মরণে সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু

কলম ছিল তাঁর অস্ত্র, সত্য ছিল তাঁর সাহস—
নীরবতার কাছে যিনি কখনো মাথা নত করেননি।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে হুমায়ুন কবীর বালু একটি সাহসী, উজ্জ্বল ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না—ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক এবং মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে সোচ্চার এক নির্ভীক কণ্ঠ। তাঁর জীবন ও কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, খুলনার সাংবাদিকতা এবং একটি অস্থির সময়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

হুমায়ুন কবীর বালুর জন্ম ১৯৪৭ সালের ৪ অক্টোবর, গোপালগঞ্জের বড়ফা গ্রামের সরদার বাড়িতে। কৈশোর-যৌবনেই তিনি যুক্ত হন দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে। পাকিস্তানি শাসনামলে স্বাধীনতার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর জীবন তাই অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

স্বাধীনতার উত্তাল সময়ে খুলনা শহরে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গেও তাঁর নাম গভীরভাবে স্মরণ করা হয়। স্বাধীনতার চেতনা তাঁর কাছে ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; ছিল জীবনযাপনের বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা।

স্বাধীনতার পর তিনি সাংবাদিকতাকে বেছে নেন পেশা ও জনসম্পৃক্ততার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। তিনি ছিলেন খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জন্মভূমি-র সম্পাদক। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্বেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি ১৯৮৪, ১৯৯৮ ও ২০০৩ সালে খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে খুলনা জোনাল নিউজপেপার এডিটরস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এবং ১৯৯৮ সালে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার আগে থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৭৬ সালে খুলনা শহর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হয়ে উঠেছিল সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার।

কর্মজীবনের স্বীকৃতিও এসেছে একের পর এক। ১৯৯২ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে পান ড. আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশনের স্বর্ণপদক। আর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর, ২০০৯ সালে সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

কিন্তু একজন সাহসী সাংবাদিকের জীবন যে কত নির্মমভাবে থামিয়ে দেওয়া যায়, তাঁর মৃত্যু তারই বেদনাদায়ক উদাহরণ।

২০০৪ সালের ২৭ জুন।

সেদিন খুলনা শহরের শান্তিধাম মোড়ে তাঁর অফিস-বাসার সামনে বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় গুরুতর আহত হন হুমায়ুন কবীর বালু। হাসপাতালে নেওয়ার পর অস্ত্রোপচারের সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫৬ বছর।

আরও মর্মস্পর্শী হলো—সেদিন তিনি তাঁর পিতৃগৃহ থেকে ফিরছিলেন। মেয়ের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলের আনন্দে মায়ের জন্য মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই আনন্দঘন পারিবারিক মুহূর্ত শেষে বাড়ি ফেরার পথেই ঘাতকের বোমা তাঁর জীবন কেড়ে নেয়।

তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের স্বজন হারানোর ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সত্য প্রকাশের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সমাজের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। তাঁর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানায়, তাঁর হত্যাকারীদের বিচারের দাবি ওঠে।

পরবর্তীতে এ হত্যাকাণ্ডের একটি মামলায় পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও, বালু হত্যার বিচার নিয়ে সাংবাদিক সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়ে গেছে। ২০২৬ সালেও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভায় মামলাটি পুনঃতদন্ত এবং প্রকৃত অপরাধী ও মদদদাতাদের বিচারের দাবি উঠেছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে ফিরে তাকালে মনে হয়—কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কর্মের আলো নিভে যায় না। হুমায়ুন কবীর বালু তেমনই একজন। তাঁর হাতে ধরা কলম থেমে গেছে, কিন্তু সত্যের পক্ষে তাঁর উচ্চারণ থামেনি। তাঁর রক্তাক্ত মৃত্যুর মধ্য দিয়েও তিনি রেখে গেছেন সাংবাদিকতার সাহস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৪ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন।
জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রয়াত সাংবাদিককে স্মরণ করা নয়; বরং সত্য, সাহস ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাকেও স্মরণ করা।

হুমায়ুন কবীর বালু নেই—
কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর সাহস এবং তাঁর আত্মত্যাগ এখনও কথা বলে।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি শহীদ সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালুকে।

তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
শ্রদ্ধাঞ্জলী।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।