বাংলাদেশ ক্রিকেটে মাশরাফি বিন মুর্তজার পরিচয় শুধু একজন পেসার কিংবা অধিনায়ক হিসেবে নয়। চোট, অনিশ্চয়তা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বারবার মাঠে ফিরে আসার যে গল্প তিনি লিখেছেন, সেটিই তাকে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। আজ ৫ অক্টোবর, মাশরাফির জন্মদিন। ১৯৮৩ সালের এই দিনে নড়াইলে জন্ম নেওয়া সাবেক এই অধিনায়ক ৪৩ বছরে পা দিয়েছেন।
শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি মাশরাফির আগ্রহ ছিল। ক্রিকেটে মনোযোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার প্রতিভা নজরে আসে। ডানহাতি পেসার হিসেবে গতি ও আক্রমণাত্মক বোলিং দিয়ে তিনি নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন। নড়াইল থেকে উঠে আসা এই ক্রিকেটার পরে জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেসার হয়ে ওঠেন।
২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মাশরাফির। এরপর বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—তিন সংস্করণেই। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায় ছিল ওয়ানডে ক্রিকেটে।
মাশরাফির আন্তর্জাতিক পথচলায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল চোট। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে হাঁটু ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। একাধিকবার দীর্ঘ পুনর্বাসন শেষে ফিরতে হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে। এমন পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়েননি তিনি। বরং প্রতিটি প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে তার লড়াকু ভাবমূর্তি।
অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফির সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ের একটি ছিল ২০১৫ সাল। ওই বছরের বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় ছিল সেই অভিযানের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। বিশ্বকাপের পর দেশের মাটিতে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ও বাংলাদেশের ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
মাশরাফির নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল দলের ভেতরে বিশ্বাস তৈরি করা। মাঠে তিনি নিজে সামনে থেকে লড়াই করার চেষ্টা করতেন এবং সতীর্থদেরও চাপের পরিস্থিতিতে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখতে উৎসাহিত করতেন। তার অধিনায়কত্বের সময় বাংলাদেশ বড় দলগুলোর বিপক্ষে আরও ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা দেখায়।
চোটের কারণে তার টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার তুলনামূলকভাবে আগেই থেমে যায়। ওয়ানডেতে অবশ্য দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায়ের পর জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামেননি তিনি। তবে ক্রিকেটের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
মাশরাফির জনপ্রিয়তা ক্রিকেট মাঠের বাইরেও বিস্তৃত। জন্মস্থান নড়াইলে তিনি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও এই নামটি তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে। জন্মদিনে প্রতিবছর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে শুভেচ্ছা জানান এবং তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ফিরে দেখেন।
মাশরাফির ক্যারিয়ারকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে তার প্রভাবের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পথচলা ছিল বারবার ফিরে আসার গল্প। চোট তাকে থামিয়েছে, কিন্তু স্থায়ীভাবে সরিয়ে দিতে পারেনি। অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্ব বাংলাদেশের ক্রিকেটকে একটি আত্মবিশ্বাসী পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক খেলোয়াড়ই নিজেদের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। মাশরাফির বিশেষত্ব হলো, তিনি একই সঙ্গে পারফর্মার, অধিনায়ক এবং লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর কয়েক বছর পরও তার নাম ঘিরে সমর্থকদের আবেগ কমেনি। ৪৩তম জন্মদিনে সেই দীর্ঘ ক্রিকেটযাত্রা আবারও মনে করিয়ে দেয়—কখনও কখনও একজন ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পরিসংখ্যান নয়, প্রতিকূলতার মুখে তার ফিরে আসার ক্ষমতা।


