মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় পরকীয়ার জের ধরে ভাবি ও নিজের শিশু ভাতিজাকে নির্মমভাবে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত দেবর সোলাইমান হোসেনকে (৩৪) ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সাটুরিয়া থানার এই বহুল আলোচিত দ্বৈত হত্যা মামলার রায় ঘিরে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক কৌতূহল ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এসকেএম তোফায়েল হাসান জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্ত সোলাইমান হোসেন সাটুরিয়া উপজেলার উত্তর কাউন্নারা গ্রামের বাসিন্দা।
মামলার এজাহার ও পুলিশি তদন্তের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে সাটুরিয়ার উত্তর কাউন্নারা গ্রামে এই লোমহর্ষক জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। আসামি সোলাইমান হোসেনের সঙ্গে তার ভাবি পারভীনের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের একপর্যায়ে পারভীন তাকে পারিবারিকভাবে বিয়ের জন্য অব্যাহত চাপ দিতে থাকেন। তবে সোলাইমান বিয়েতে রাজি না হওয়ায় দুজনের মধ্যে তীব্র মানসিক বিরোধ ও বিবাদের সৃষ্টি হয়।
এই বিরোধের জেরে ঘটনা ঘটে যাওয়ার দিন সোলাইমান ধারালো ছুরি দিয়ে ভাবি পারভীনকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করেন। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড চলাকালে সেখানে হাজির হয়ে যায় পারভীনের শিশুসন্তান এবং সোলাইমানের নিজের ভাতিজা আব্দুন নূর। শিশুটি পুরো ঘটনাটি দেখে ফেলায় আলামত মোছার উদ্দেশ্যে ও নিজের অপরাধ ঢাকতে সোলাইমান তার নিষ্পাপ ভাতিজাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যান।
হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর সাটুরিয়া থানা পুলিশ দ্রুত অভিযানে নেমে অভিযুক্ত সোলাইমান হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অপরাধের সত্যতা স্বীকার করেন এবং পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজ মুখে হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট দাখিল করার পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, নথিপত্র পর্যালোচনা ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আসামি সোলাইমানকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
আদালতের এই রায়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এএফএম নুরতাজ আলম বাহার। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ছয় বছর পর একটি মা ও তার শিশুসন্তানকে নৃসংসভাবে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে আসামিকে মাত্র ১০ বছরের সাজা দেওয়া অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। বিচারিক আদালতের এই রায়ে বাদীপক্ষ কোনোভাবেই ন্যায়বিচার পায়নি বলে মনে করে। তাই আসামির সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আমরা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করব।
অন্যদিকে, রায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুল ইসলাম দাবি করেন, মামলার প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের গুরুতর গলদ ও অসঙ্গতি রয়েছে। যে ছুরি দিয়ে জোড়া খুন সংঘটিত হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষার পর আদালতে যথাযথ আইনি প্র নিয়মে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তদন্তে ত্রুটি থাকায় এখানে প্রকৃত আসামির ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আসামিকে সম্পূর্ণ খালাস পাওয়ার লক্ষ্যে আমরা উচ্চ আদালতে দ্রুত আপিল করব।


