চাঁদপুরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতার পিটুনিতে নিহত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তাঁর ছেলে অভিনেতা শান্ত খানের মরদেহ প্রায় দুই বছর পর কবর থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে বুধবার সকালে চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের পারিবারিক কবরস্থান থেকে মরদেহ দুটি উত্তোলন করা হয়।
চাঁদপুর পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক চাঁদ মিয়া জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মরদেহ দুটি উত্তোলনের পর চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেখানে ময়নাতদন্ত করা হবে।
মরদেহ উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রত্যয় হাশেম। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে ময়নাতদন্তের জন্য সেলিম খান ও তাঁর ছেলে শান্ত খানের মরদেহ কবর থেকে তোলা হয়েছে।
সেলিম খান লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতির বাইরে চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান শাপলা মিডিয়ার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
সেলিম খানের বিরুদ্ধে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে সম্পদ অর্জন, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব ফাঁকিসংক্রান্ত মামলার কথাও বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা নিষ্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে শান্ত খান ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘টুঙ্গিপাড়ার মিয়া ভাই’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন বিকেলে সেলিম খান ও শান্ত খান একটি গাড়িতে করে এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন। পথে চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের ফরক্কাবাদ বাজার এলাকায় বিক্ষুব্ধ জনতার মুখে পড়েন তাঁরা।
তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক চাঁদ মিয়া জানান, ওই সময় সেলিম খান নিজের পিস্তল থেকে গুলি করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে তাঁদের গাড়ি পাশের বাগড়া বাজার এলাকায় আটকে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা গাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং পিটুনিতে বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন তাঁদের মরদেহ চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। তৎকালীন পরিস্থিতিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছিল। পরে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর ঘটনায় তখন থানায় কোনো মামলা হয়নি। পরে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল কুদ্দুস সরকার বাদী হয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় ১৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মামলাটির তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আদালত সেলিম খান ও শান্ত খানের মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর মরদেহ উত্তোলনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে পুলিশ। জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের পর বুধবার সকালে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মরদেহ দুটি কবর থেকে তোলা হয়।
এখন তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রধান গুরুত্ব ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের দিকে। চাঁদপুর সদর মডেল থানার ওসি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে।
ময়নাতদন্তের মাধ্যমে সেলিম খান ও শান্ত খানের শরীরে কী ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল, সেসব আঘাত মৃত্যুর কারণ হয়েছিল কি না এবং মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা জানার সুযোগ রয়েছে।
তবে প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কিংবা ঘটনার সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের ফল, মামলার অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


