প্রায় এক যুগ আগে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ দিয়ে মনিরুজ্জামান মাতুব্বর ওরফে হৃদয়ের অপরাধজীবনের শুরু। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় চার বছর কারাগারে থাকার পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু মুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরেননি। বরং আবারও আত্মগোপনে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন আরও গুরুতর অপরাধে। একপর্যায়ে এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায়ও তাঁর নাম উঠে আসে। সর্বশেষ ঢাকার আশুলিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর স্বামীকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গ্রেপ্তারের পর ওই জোড়া হত্যাকাণ্ডের দায় আদালতে স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন মনিরুজ্জামান। বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
স্ত্রী হত্যার অভিযোগে প্রথম মামলা
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মনিরুজ্জামান ওরফে মনির হোসেন ওরফে হৃদয় মাতুব্বরের বয়স ৪৪ বছর। তাঁর বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দামদরদি গ্রামে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।
২০১৪ সালে নগরকান্দায় নিজের স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্ত্রীকে হত্যার পর তিনি পালিয়ে যান। পরে এ ঘটনায় নগরকান্দা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়।
মামলার তদন্তে যুক্ত তৎকালীন এসআই আবদুল কুদ্দুসের ভাষ্য অনুযায়ী, মনিরুজ্জামান আগে থেকেই উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবের ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিরোধে জড়াতেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হলেও সংসার জীবনে তাঁর আচরণে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর পুলিশ তাঁকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করে।
ওই মামলায় প্রায় চার বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পান তিনি। কিছুদিন এলাকায় থাকার পর আবারও আত্মগোপনে চলে যান। মামলায় হাজির না হওয়ায় আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
আশুলিয়ায় আত্মগোপন, বাড়তে থাকে অভিযোগ
জামিনে বের হওয়ার পর মনিরুজ্জামান সাভারের আশুলিয়া এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের তদন্তে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসতে থাকে।
সবশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে আশুলিয়ার মধ্য জামগড়ার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম (৩৯) ও তাঁর স্বামী আলমগীর কবিরের (৪৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নাজমা একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর স্বামী আলমগীরও আগে পোশাক কারখানায় কাজ করলেও হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি বেকার ছিলেন। তাঁদের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায়।
ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে নাজমার গর্ভের সন্তানও মারা যাওয়ার ঘটনায়। একই কক্ষে নাজমার মরদেহের পাশাপাশি নবজাতকের মরদেহ পাওয়া যায়। অন্যদিকে আলমগীরের মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় ছিল।
এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার নেয় পিবিআই ঢাকা জেলা।
তদন্তে বেরিয়ে আসে মনিরুজ্জামানের নাম
পিবিআইয়ের তদন্তে শুরুতে হত্যাকাণ্ডের স্পষ্ট কোনো সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে মনিরুজ্জামানকে শনাক্ত করা হয়।
৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি আলমগীর ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমাকে হত্যার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাজমার ব্যবহৃত পার্স, মুঠোফোন, সিমকার্ড ও পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। পরে আদালতে তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।
সম্পর্কের বিরোধ থেকে জোড়া হত্যার অভিযোগ
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, আশুলিয়ায় থাকার সময় আলমগীরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের পরিচয় হয়। কাছাকাছি এলাকায় বসবাসের কারণে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। মনিরুজ্জামান সবজির ব্যবসা করতেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, নাজমার সঙ্গে আগে থেকেই মনিরুজ্জামানের সম্পর্ক ছিল। তাঁকে বিয়ের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল বলেও তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। বিষয়টি আলমগীর জানতে পারার পর দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর আলমগীর ও নাজমা দাওয়াত দিয়ে মনিরুজ্জামানকে নিজেদের বাসায় ডেকে নেন। সেখানে নাজমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলমগীরের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গড়ায়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ধস্তাধস্তির সময় নাজমা ঝাঁটা দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। জবাবে তিনি নাজমার পেটে লাথি মারেন। এতে নাজমা খাটের ওপর পড়ে যান এবং গুরুতর আঘাত পান। তাঁর গর্ভের সন্তানও মারা যায়।
এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যার পর আলমগীরের মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নাজমার মুঠোফোন, সিমকার্ড, পরিচয়পত্র ও পার্স নিয়ে নিজের বাসায় চলে যান মনিরুজ্জামান।
একের পর এক মামলায় দীর্ঘ অপরাধের ইতিহাস
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ একদিনে তৈরি হয়নি। ২০১৪ সালের স্ত্রী হত্যার মামলা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে আরও গুরুতর অপরাধে তাঁর নাম এসেছে। স্ত্রী হত্যা মামলায় জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তিনি আবার আত্মগোপনে চলে যান এবং আশুলিয়ায় অবস্থান করে নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায়ও তাঁর নাম তদন্তে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে এসব ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।
আশুলিয়ার জোড়া হত্যার ঘটনায় মনিরুজ্জামানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
এক যুগ আগে স্ত্রী হত্যার অভিযোগে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, সেই মনিরুজ্জামানের নাম আবারও গুরুতর হত্যাকাণ্ডে উঠে আসায় তাঁর দীর্ঘ অপরাধ-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এখন তদন্তকারীদের সামনে মূল লক্ষ্য হলো আশুলিয়ার জোড়া হত্যার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার সব দিক যাচাই করে মামলাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করা।


