একদিন যে মুখে ছিল দীপ্তি, যে কণ্ঠে ছিল আগুন—আজ সে মুখ বিস্মৃতির অন্ধকারে, সে কণ্ঠও নীরবতার ওপারে। অথচ একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে সেই কণ্ঠই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস, আর পাকিস্তানি হানাদারদের জন্য ছিল আতঙ্কের প্রতিধ্বনি।
যে দুরন্ত স্বপ্ন চোখে নিয়ে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, স্বাধীনতার পর হয়তো সেই স্বপ্নের অনেকটাই তাঁর চোখের সামনে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সে কারণেই জীবনের শেষ পর্বে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। দূরে সরে গিয়েছিলেন কোলাহল থেকে, মানুষের ভিড় থেকে, এমনকি একসময় নিজের সৃষ্টির জগত থেকেও।
তিনি কি আর খুঁজে পেতেন সেই উত্তাল মার্চকে? মনে পড়ত কি ২৫ মার্চের কালরাত্রি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই প্রিয় দেশ? মনে পড়ত কি বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক আহ্বান?
২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতে নিজের জীবন বিপন্ন করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অত্যন্ত গোপনে জরুরি বার্তা চট্টগ্রামে এম. আর. সিদ্দিকীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সেই দুঃসাহসী ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতার বহু বছর পর, ২০১২ সালে, পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক।
এতক্ষণ যাঁর কথা বলছিলাম, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা নয়ীম গহর।
নয়ীম গহর ছিলেন এক বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী—গীতিকার, কবি, ঔপন্যাসিক, গায়ক, অভিনেতা, নাট্যকার, বিবিসির বাংলা ভাষ্যকার ও সংবাদ পাঠক। তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তার ছিল বিশাল, কিন্তু জীবনযাপন ছিল আশ্চর্য রকমের নিরহংকার ও নিভৃত।
১৯৩৬ সালের ১৫ আগস্ট বিক্রমপুর পরগনার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবনেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।
কৈশোর-তারুণ্যেই তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ইংরেজি কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু; তৎকালীন প্রথম সারির ইংরেজি পত্রিকা অবজারভার-এও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। পরে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘শব ও স্বগতোক্তি’ এবং ‘নিষিদ্ধ বিছানা’। গল্পগ্রন্থ ‘রাহুগ্রাস’-ও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের উজ্জ্বল নিদর্শন। পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে তাঁর অসংখ্য কবিতা ও ছোটগল্প।
তবে কবি নয়ীম গহর ছিলেন বড় অগোছালো। নিজের সৃষ্টির সংরক্ষণে তেমন মনোযোগী ছিলেন না। ফলে তাঁর বহু মূল্যবান লেখা আজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা জায়গায়—যেন এক সৃষ্টিশীল জীবনের অযত্নে হারিয়ে যাওয়া অমূল্য পাণ্ডুলিপি।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে ব্যাপক ও জনমানসে স্থায়ী পরিচয়—গীতিকার নয়ীম গহর।
একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে তাঁর গান হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার ভাষা। তাঁর কলমে জন্ম নিয়েছিল এমন সব গান, যার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ছিল দেশ, স্বাধীনতা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের উত্তাপ—
‘নোঙর তোলো তোলো, সময় যে হলো হলো’,
‘সাগর পাড়িতে ঝড় জাগে যদি জাগতে দাও’,
‘পুবের ওই আকাশে সূর্য উঠছে আলোকে আলোকময়’,
‘জয় জয় জয় জয় বাংলা’,
‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’।
এই গানগুলো শুধু গান ছিল না; একাত্তরের প্রজন্মের কাছে এগুলো ছিল সাহসের উচ্চারণ, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার অঙ্গীকার।
দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি আধুনিক ও উচ্চাঙ্গসংগীতেও তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্ট গানের সংখ্যা প্রায় দুইশো। তাঁর কলমে প্রেম, প্রকৃতি, দেশ ও মানুষের নানা অনুভূতি পেয়েছে নিজস্ব সুর ও ভাষা।
স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর রচিত প্রথম নাটক ‘পাখি আমার জয়ন্ত’—যেখানে ‘জয়ন্ত’ ছিল তাঁর নিজের ছেলের নাম—বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।
ফজলে লোহানীর সঙ্গে মিলে তিনি টেলিভিশনে সৃষ্টি করেছিলেন একেবারেই নতুন ধারার অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’। তাঁরই লেখা সেই জনপ্রিয় পঙ্ক্তি—
‘ইচ্ছে করেই যারা ভুল করেন,
জেনেও না জানার ভান করেন,
তাদের কিছু ভুল বুঝিয়ে দেব।’
নয়ীম গহরের অভিনয় প্রতিভাও ছিল উজ্জ্বল। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাঁকে চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন। সে সময়ের চলচ্চিত্র ম্যাগাজিন রূপছায়া তাঁর ছবি ছেপে লিখেছিল—‘সম্ভাবনাময় একটি মুখ, আগামীতে এর পরিচয় পাবেন।’
কিন্তু সেই ‘সম্ভাবনাময় মুখ’ শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের নায়ক হওয়ার চেয়ে আরও বড় এক পরিচয় বেছে নিয়েছিলেন—তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের সাক্ষী, মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর এবং মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক সৃষ্টিশীল মানুষ।
এই দেশ ও জাতির জন্য এত কিছু করেও জীবনের শেষ পর্বে তিনি ছিলেন আশ্চর্য নিভৃতচারী। ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। একসময় যে কণ্ঠে ছিল উদ্দীপনা, যে চোখে ছিল দুরন্ত স্বপ্ন—জীবনের শেষ প্রান্তে সেই চোখে নেমে এসেছিল ক্লান্তির ছায়া।
কী অভিমান ছিল তাঁর?
কী না-পাওয়ার বেদনা?
কোন স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল স্বাধীনতার পর?
আমরা জানি না।
শুধু জানি, একদিন সত্যিই নোঙর তুলেছিল তাঁর জীবন-তরী।
৭ অক্টোবর ২০১৫ থেমে যায় তাঁর পার্থিব যাত্রা। নিভে যায় এক দীপ্ত কণ্ঠ। বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যান একাত্তরের সেই সাহসী যোদ্ধা, এক অসাধারণ সৃষ্টিশীল মানুষ—নয়ীম গহর।
তাঁর কন্যাদ্বয়ও বাবার সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন—সংগীতশিল্পী তাজরীন গহর এবং নাটক ও চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেত্রী ইলোরা গহর।
নয়ীম গহর আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর গান আছে, তাঁর শব্দ আছে, তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আছে। আছে সেই অমর আহ্বান—
নোঙর তোলো তোলো,
সময় যে হলো হলো…
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ থেকে যায় সময়ের ভেতর। নয়ীম গহর তেমনই একজন—
বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এক অমূল্য মানিক।
তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।



