পর্দায় জীবনের গল্প, হৃদয়ে মানবতার স্পন্দন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নির্মাতার নাম চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে তাঁদের সৃষ্টির অসাধারণ শক্তি, মানবিক আবেদন এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান তাঁদেরই একজন। যিনি ক্যামেরার চোখে শুধু গল্প দেখেননি, দেখেছেন মানুষের সুখ-দুঃখ, সমাজের অসংগতি, বিবেকের তাড়না এবং জীবনের নির্মম বাস্তবতা।
তাঁর পরিচালিত ‘ছুটির ঘণ্টা’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। একটি শিশুর অসহায়ত্ব ও মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে তিনি যে বেদনার ছবি এঁকেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের হৃদয়কে আলোড়িত করেছে। অন্যদিকে ‘অশিক্ষিত’-এর মতো চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন শিক্ষার আলোয় সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন।
আজিজুর রহমান ছিলেন সেই বিরল নির্মাতাদের একজন, যাঁদের চলচ্চিত্র বিনোদনের গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়, চোখে জল আনে, আবার নতুন করে ভাবতেও শেখায়।
জন্ম, শৈশব ও শিল্পী হয়ে ওঠার প্রস্তুতি
আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১০ অক্টোবর, তৎকালীন বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলের সান্তাহার রেলওয়ে জংশন শহরের কলসা সাঁতাহার মহল্লায়। তাঁর পিতার নাম রুপচাঁন প্রামাণিক।
ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। স্থানীয় আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ঢাকা সিটি নাইট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে চারুকলা আর্ট ইনস্টিটিউটে কমার্শিয়াল আর্ট বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
চারুকলার এই শিক্ষা তাঁর শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করে। দৃশ্যের বিন্যাস, মানুষের অভিব্যক্তি এবং কাহিনির আবেগকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর চিত্রকলাবিষয়ক জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র পরিচালনায় তাঁর যে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে ওঠে, তার পেছনে এই শিল্পবোধের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
সহকারী পরিচালক থেকে নিজস্ব পরিচয়ের নির্মাতা
১৯৫৮ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশামের সহকারী হিসেবে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে আজিজুর রহমানের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা।
সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের নানা কৌশল, অভিনয় পরিচালনা, দৃশ্যায়ন এবং কাহিনিকে পর্দায় রূপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে একসময় নিজেই পরিচালকের আসনে বসেন।
তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান’। ময়মনসিংহের লোকগাথাভিত্তিক এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে চলচ্চিত্রের ভাষায় উপস্থাপন করেন।
শুরু থেকেই তাঁর নির্মাণে মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং আবেগের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দর্শকের সঙ্গে সহজে সংযোগ স্থাপন করার ক্ষমতা ছিল তাঁর চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
‘অশিক্ষিত’ : শিক্ষার আলোয় বদলে যাওয়ার গল্প
আজিজুর রহমানের পরিচালিত ‘অশিক্ষিত’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একটি স্মরণীয় নাম। চলচ্চিত্রটির মূল বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং মানুষের জীবন পরিবর্তনের সম্ভাবনা।
শিক্ষা অর্জনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই—জীবনের যেকোনো পর্যায়েই মানুষ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারে। এই মানবিক সত্যকে সহজবোধ্য ও আবেগঘনভাবে তুলে ধরে ছবিটি।
শিক্ষা শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; শিক্ষা মানুষকে সচেতন করে, নিজের অধিকার বুঝতে শেখায় এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার পথ দেখায়। ‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রের সামাজিক আবেদন এখানেই।
সাধারণ মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা তুলে ধরার যে দক্ষতা আজিজুর রহমান দেখিয়েছেন, এই চলচ্চিত্র তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
‘ছুটির ঘণ্টা’ : যে কান্না আজও থামেনি
আজিজুর রহমানের নামের সঙ্গে যে চলচ্চিত্রটি চিরস্থায়ীভাবে জড়িয়ে আছে, সেটি হলো ‘ছুটির ঘণ্টা’। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশের দর্শকসমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ছবির কাহিনিতে একটি শিশু স্কুলের বাথরুমে আটকে পড়ে। স্কুল ছুটি হয়ে যায়, সবাই বাড়ি ফিরে যায়; কিন্তু শিশুটি থেকে যায় চার দেয়ালের ভেতর বন্দি। বাইরে পৃথিবী চলতে থাকে স্বাভাবিক নিয়মে, আর ভেতরে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয় ও বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে শিশুটি অপেক্ষা করে সাহায্যের।
একটি নিষ্পাপ প্রাণের সেই অসহায় অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। দর্শক অনুভব করেন শিশুটির ভয়, তার একাকিত্ব এবং তাকে হারিয়ে ফেলার অসহনীয় বেদনা।
কিন্তু ‘ছুটির ঘণ্টা’ কেবল একটি শিশুর মৃত্যুর কাহিনি নয়। এটি দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে এক গভীর মানবিক সতর্কবার্তা। সামান্য অসতর্কতা কীভাবে একটি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকের অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে—ছবিটি সেই নির্মম সত্য তুলে ধরে।
এই চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
‘ছুটির ঘণ্টা’র সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, ছবিটি শেষ হয়ে গেলেও তার বেদনা শেষ হয় না। শিশুটির অসহায় মুখ, বাঁচার আকুতি এবং নির্মম পরিণতির কথা মনে পড়লে আজও দর্শকের হৃদয় ভারী হয়ে আসে।
একজন নির্মাতার শিল্প তখনই সার্থক হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের অনুভূতির অংশ হয়ে বেঁচে থাকে। ‘ছুটির ঘণ্টা’র মধ্য দিয়ে আজিজুর রহমান সেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন।
চলচ্চিত্রের বিস্তৃত ভুবনে
আজিজুর রহমানের চলচ্চিত্রজীবন ছিল বহুমাত্রিক। সামাজিক ও পারিবারিক জীবন, মানুষের সম্পর্ক, নৈতিক সংকট এবং সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র।
তাঁর উল্লেখযোগ্য পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মাটির ঘর’, ‘অতিথি’, ‘স্বীকৃতি’, ‘অপরাধ’, ‘গরমিল’, ‘মায়ের আঁচল’ ও ‘জনতা এক্সপ্রেস’।
‘মাটির ঘর’সহ তাঁর বিভিন্ন চলচ্চিত্রে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের নানা টানাপোড়েন উঠে এসেছে। সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কাহিনি, পরিচিত জীবনচিত্র এবং আবেগঘন উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দর্শকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি উর্দু চলচ্চিত্রও পরিচালনা করেছেন তিনি। ‘মেরে আরমান মেরে স্বপ্নে’, ‘সাত সেহেলী’, ‘পরদেশী’ ও ‘রেহেনে দো’ তাঁর উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
প্রযোজক হিসেবেও তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে অবদান রেখেছেন। ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘রঙিন রূপবান’, ‘কাঞ্চনমালা’ ও ‘জিদ’ তাঁর প্রযোজনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পরিচালনা ও প্রযোজনার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়; তবে তাঁর দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে চলচ্চিত্রে ধারণের স্বপ্ন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই ইতিহাসকে চলচ্চিত্রে ধারণ করার আকাঙ্ক্ষা থেকে আজিজুর রহমান ২০১৬ সালে ‘মাটি’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আত্মত্যাগ ও জাতীয় ইতিহাসকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার এই উদ্যোগ তাঁর শিল্পীজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তবে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ ও মুক্তির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করে বিস্তারিত উল্লেখ করাই সমীচীন।
মরণোত্তর একুশে পদক : প্রাপ্য স্বীকৃতি
দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করলেও রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ক্ষেত্রে আজিজুর রহমানের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পেতে সময় লেগেছে।
২০২৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তবে একজন শিল্পীর প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু পদক কিংবা পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর সৃষ্টিকর্ম মানুষের মনে কতটা স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে, সময়ের পরীক্ষায় কতটা টিকে আছে এবং সমাজকে কতটা ভাবতে শিখিয়েছে—সেই বিবেচনাতেই তাঁর শিল্পীসত্তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয়।
আজিজুর রহমানের ক্ষেত্রে ‘অশিক্ষিত’ ও ‘ছুটির ঘণ্টা’র মতো চলচ্চিত্র তাঁর শিল্পীজীবনের উজ্জ্বল সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
প্রস্থান : স্রষ্টা চলে যান, সৃষ্টি থেকে যায়
২০২২ সালের ১৪ মার্চ কানাডার টরন্টোয় এই গুণী চলচ্চিত্র পরিচালকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন হারায় একজন অভিজ্ঞ ও সৃজনশীল নির্মাতাকে। পরবর্তী সময়ে তাঁর মরদেহ জন্মস্থান সান্তাহারে সমাহিত করা হয় বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি রয়ে গেছে। ‘ছুটির ঘণ্টা’র সেই শিশুর অসহায়ত্ব, ‘অশিক্ষিত’-এর শিক্ষার স্বপ্ন এবং মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ নানা গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি আজও দর্শকের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়—এটি মানুষের বিবেক জাগিয়ে তোলার, সামাজিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার এক অসাধারণ মাধ্যম।
কালের প্রবাহে অনেক চলচ্চিত্রের নাম বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। আজিজুর রহমানের ‘ছুটির ঘণ্টা’ তেমনই একটি চলচ্চিত্র—যার বেদনা আমাদের সংবেদনশীল করে, যার বার্তা আমাদের সতর্ক করে এবং যার স্মৃতি আমাদের মানবিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
চলচ্চিত্রের পর্দায় তিনি এঁকেছিলেন জীবনের গল্প; সেই গল্পের আবেগ ও মানবিক আবেদন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে দর্শকের হৃদয়ে।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।


