শর্টকাটের কথা বলে নির্জন পথে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা, গ্রেপ্তার চালক

শনিবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কুমিল্লা জেলা পুলিশ কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। এ সময় লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানসহ জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় সুমনের এককভাবে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি হবে।

এর আগে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়াকে আটক করা হয়। ঘটনার পর তিনি পালিয়ে গিয়ে নিজের ভাইয়ের কাছে আত্মগোপন করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বাসায় ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠে কিশোরী

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় একটি বাস থেকে নামে ওই কিশোরী। এরপর বাসায় ফেরার জন্য তিশা বাস কাউন্টারের সামনে অটোরিকশা খুঁজছিল সে। একপর্যায়ে ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক করে সুমনের চালানো সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে।

অটোরিকশায় ওঠার পর কিছুটা সামনে গিয়ে চালককে ১০০ টাকা দেয় কিশোরী। ওই টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনেন সুমন। এরপর তিনি কিশোরীকে শর্টকাট পথে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর কথায় রাজি হয়ে অটোরিকশায় যাত্রা অব্যাহত রাখে মেয়েটি।

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, অটোরিকশাটি কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে লালমাইয়ের দিকে এগোতে থাকে। একপর্যায়ে চালক একটি নির্জন ও অন্ধকার স্থানে গাড়িটি থামান।

পুলিশের দাবি, সেখানে কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন সুমন। এ সময় মেয়েটি চিৎকার করলে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন তিনি। পরে কিশোরীকে ধানখেতে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকগুলোর একটি হলো, বিপদের মধ্যে পড়েও বাবার কাছে সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করেছিল কিশোরীটি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে সে নিজের অবস্থান জানাতে বাবার মুঠোফোনে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল। কিন্তু তখন তার বাবা বার্তাটি দেখতে পাননি।

পরদিন ভোরে বার্তাটি চোখে পড়ার পর মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে জানতে ঘটনাস্থলের দিকে যান তিনি। সেখানে গিয়ে পুলিশকে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করতে দেখেন।

সন্তানের পাঠানো অবস্থানসংক্রান্ত বার্তা সময়মতো দেখতে না পাওয়ার এই ঘটনা পরিবারের জন্য গভীর শোকের পাশাপাশি উদ্বেগেরও কারণ হয়ে উঠেছে। তবে ওই বার্তা কখন পাঠানো হয়েছিল, সেটি গ্রহণ বা দেখার সুনির্দিষ্ট সময় এবং এর মাধ্যমে পুলিশকে দ্রুত জানানো সম্ভব ছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়নি।

পুকুরে গোসল করে আইফোন ফেলে চট্টগ্রামে পালান

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোরীকে হত্যার পর ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি রেখে চলে যান সুমন। পরে একটি পুকুরে গোসল করেন তিনি। এরপর কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনটি একটি জঙ্গলে ফেলে রেখে চট্টগ্রামে চলে যান।

পুলিশ জানিয়েছে, সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিশোরীর আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধের পর তাঁর পালিয়ে যাওয়া, আত্মগোপন এবং মুঠোফোন ফেলে রাখার বিষয়গুলো তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উদ্ধার করা ফোনের তথ্য-উপাত্ত ঘটনার সময়রেখা, যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানায়নি।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার একটি ধানখেতের আইলের পাশ থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল পুলিশ।

ভাড়ায় অটোরিকশা চালাতেন সুমন

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন মিয়ার বয়স ৩৫ বছর। তাঁর বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। নিজের বাড়িতে জমিজমা ও ঘর না থাকায় তিনি লালমাই উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। ভাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন বেশির ভাগ সময় রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতেন। ফলে রাতের বেলায় যাত্রী ওঠানো, গন্তব্য নির্ধারণ এবং নির্জন সড়কে চলাচলের বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাতের যাত্রায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

কুমিল্লার এই হত্যাকাণ্ড রাতের বেলায় গণপরিবহন ও ভাড়ায় চালিত যানবাহনে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরার সময় অনেক যাত্রীকে অপরিচিত চালকের যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। যাত্রীসংখ্যা কম থাকলে কিংবা বিকল্প পরিবহন না পেলে নির্জন পথে চলাচলের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

তবে নিরাপত্তার দায় কেবল যাত্রীর ব্যক্তিগত সতর্কতার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। চালকের পরিচয় যাচাই, যানবাহনের নিবন্ধন ও অনুমোদন নিশ্চিত করা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং অপরাধের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত—এসব ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাত্রাপথ ও সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময় ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজনে লাইভ লোকেশন পাঠানো সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা অপরাধ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না; যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারিও প্রয়োজন।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে সুমনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এখন ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, উদ্ধার করা আলামত ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর এমন মৃত্যুতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।