ময়মনসিংহের গৌরীপুরে দুই বছরের শিশু ওয়াসকুরুনি ইসলামকে বিষ পান করিয়ে হত্যার ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তাঁর সৎমা আকলিমা আক্তার। সতিনের ছেলে হওয়ায় শিশুটিকে নিজের পথের বাধা মনে করতেন বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে, ঘটনার সঙ্গে শিশুটির বাবার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখতে তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছে পুলিশ।
শুক্রবার বিকেলে ময়মনসিংহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তাহমিনা আক্তারের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আকলিমা। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক পি এস এম মোস্তাছিনুর রহমান ও গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান জানান, শিশু ওয়াসকুরুনি হত্যার ঘটনায় নিজের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন আকলিমা। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সৎমায়ের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, সতিনের ছেলে হওয়ায় ওয়াসকুরুনিকে নিজের জন্য বাধা মনে করতেন তিনি। নিজের পথ পরিষ্কার করতেই শিশুটিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে জবানবন্দির বরাতে জানিয়েছেন গৌরীপুর থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান।
যেভাবে ঘটে ঘটনা
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার গৌরীপুর উপজেলার বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামের বাড়িতে শিশুটিকে বিষ পান করানো হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিশুটির মা শেফালী বেগম লিখিত অভিযোগ করেন। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে পুলিশ শিশুটির বাবা আবদুল কাদির ও সৎমা আকলিমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে।
শেফালী বেগমের অভিযোগ, তাঁর ছেলেকে বিষ পান করিয়ে হত্যার ঘটনায় আবদুল কাদির ও তাঁর বর্তমান স্ত্রী জড়িত। তিনি আরও দাবি করেন, তাঁকে না জানিয়েই শিশুটির মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়। এ সময় সৎমাকে শিশুটির আসল মা হিসেবে পরিচয় দিয়ে গোপনে দাফনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান শেফালী।
তবে শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালতে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
ওসি মো. হাবিবুর রহমান জানান, আবদুল কাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটির শুনানি এখনো হয়নি।
বিয়ে ও পারিবারিক বিরোধের প্রেক্ষাপট
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে গৌরীপুর উপজেলার বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামের আবদুল কাদিরের সঙ্গে একই উপজেলার বড় কালীহর গ্রামের শেফালী বেগমের বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে জয়নাল আবেদীন (৮) ও ওয়াসকুরুনি ইসলাম (২) নামে দুই সন্তান রয়েছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের এক সপ্তাহ পর আবদুল কাদির আকলিমা আক্তারকে বিয়ে করেন। এরপর আগের সংসারের দুই সন্তান ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে একই সংসারে বসবাস করছিলেন তিনি।
শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শেফালী বেগম তাঁর সন্তানের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেছেন।
শিশু ওয়াসকুরুনির মৃত্যুর ঘটনায় সৎমায়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও, ঘটনার সব দিক যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুটির বাবার ভূমিকা, ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল এবং মরদেহ গোপনে দাফনের চেষ্টার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।


