বাপ্পার গানে মুখর মিলনায়তন, ‘মুনলাইট মেলোডিজে’ মুগ্ধ শ্রোতারা

আশ্বিনের শেষ সপ্তাহ। বিকেলের বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে চারপাশ। সন্ধ্যার বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা। এমন এক আবহে ঢাকার ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শুক্রবার সন্ধ্যায় তৈরি হলো অন্য রকম এক পরিবেশ। বাইরে গাড়ি রাখার জায়গা নেই, প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যস্ততা, আর মিলনায়তনের ভেতরে একটি আসনও খালি নেই। সবার অপেক্ষা একজনকে ঘিরে—সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার।

তাঁর একক কনসার্ট ‘মুনলাইট মেলোডিজ’ ঘিরে শ্রোতাদের এই উচ্ছ্বাস প্রমাণ করল, বাংলা গানের প্রতি ভালোবাসা এখনো কতটা গভীর হতে পারে। সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হওয়া আয়োজন শেষ হতে হতে রাত ১০টা ৪৫ মিনিট। মাঝখানে তিনটি বিরতি। পরিকল্পিত পরিবেশনা তালিকায় ছিল ৩০টি গান, যার মধ্যে ২৭টি গেয়ে শোনান বাপ্পা। তবে সংখ্যার হিসাবে এই সন্ধ্যার মূল্যায়ন করলে হয়তো পুরো অভিজ্ঞতাটাই অধরা থেকে যাবে। কারণ, মঞ্চে শিল্পীর কণ্ঠের সঙ্গে বারবার একাকার হয়ে উঠছিল মিলনায়তনভর্তি শ্রোতার কণ্ঠ।

শেষ দিকে বাপ্পা যখন জানালেন, এবার শেষ গানটি গাইবেন, তখন শ্রোতাদের দিক থেকে ভেসে এল অনুরোধ—আরও গান চাই। গান যেন শেষ না হয়, রাত যেন আরও দীর্ঘ হয়।

‘ধুলো পড়া চিঠি’ থেকে ‘বাজি’

‘ধুলো পড়া চিঠি’ দিয়ে শুরু হয় কনসার্ট। প্রথম গানের সুর ছড়িয়ে পড়তেই মিলনায়তনের পরিবেশ বদলে যায়। মঞ্চে বাপ্পা মজুমদার, সামনে শত শত শ্রোতা। পরিচিত গানের কথা ও সুরের সঙ্গে একে একে কণ্ঠ মেলাতে শুরু করেন দর্শকসারিতে বসে থাকা মানুষ। কেউ পুরো গান গাইছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন প্রিয় পঙ্‌ক্তিটির জন্য। সেই মুহূর্তে শিল্পী ও শ্রোতার মাঝখানে মঞ্চের দূরত্ব থাকলেও অনুভূতির জায়গায় যেন কোনো ব্যবধান ছিল না।

প্রথম পর্বে বাপ্পা পরিবেশন করেন ‘ভাঙা–গড়া’, ‘চাঁদের শহরে’, ‘আকুতি’, ‘ফিরে এসো’, ‘ফিরব না আজ বাড়ি’, ‘চোখের ভেতর স্বপ্ন থাকে’ ও ‘জোছনাবিহার’-এর মতো গান। তাঁর গানে প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে বিচ্ছেদের বেদনা, অপেক্ষা এবং হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরে পাওয়ার আকুলতা। এসব অনুভূতি শ্রোতাদের কাছে নতুন নয়। বরং বহুদিনের চেনা গানগুলোই যেন তাঁদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, সম্পর্ক ও জীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করে দিল।

কনসার্টের বিশেষত্ব ছিল এই পারস্পরিক অংশগ্রহণ। দর্শকেরা শুধু গান শুনতে আসেননি; অনেকেই যেন নিজেদের প্রিয় গানগুলো আবারও একবার বাঁচিয়ে তুলতে এসেছিলেন। মঞ্চের পরিবেশনা আর দর্শকসারির সম্মিলিত কণ্ঠ মিলিয়ে তৈরি হচ্ছিল এক ধরনের সমবেত সংগীতের আবহ।

প্রথম বিরতির পর রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে আবারও মঞ্চে ফেরেন বাপ্পা। এরপর একে একে গেয়ে শোনান ‘চোখেরই জলে’, ‘আমায় প্রশ্ন করে’, ‘জানালার গ্লাস’, ‘বৃষ্টি পড়ে’, ‘পরী’, ‘না জানি কোন অপরাধে’, ‘বুড়ি’, ‘দিন বাড়ি যায়’, ‘তোর প্রেমেতে’ ও ‘তোমাকেই বলে দেব’।

বাইরে তখনও কনসার্টের বিরতির সময়ের ব্যস্ততা। কিন্তু বিরতি শেষ হওয়ার আগেই অনেক শ্রোতা নিজেদের আসনে ফিরে আসেন। আড্ডা কিংবা খাবারের চেয়ে তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পরবর্তী পরিবেশনা। প্রিয় শিল্পীর গান সরাসরি শোনার সুযোগ যে প্রতিদিন আসে না, তা যেন সবাই উপলব্ধি করছিলেন।

পিংক ফ্লয়েডে বদলে গেল সন্ধ্যার সুর

কনসার্টের তৃতীয় পর্বে শ্রোতাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অন্য রকম চমক। এবার বাপ্পার নিজস্ব গানের গণ্ডি পেরিয়ে পরিবেশিত হয় বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েডের গান। ‘শাইন অন ইউ ক্রেজি ডায়মন্ড’, ‘হে ইউ’ ও ‘উইশ ইউ ওয়্যার হিয়ার’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সন্ধ্যার সংগীতযাত্রায় যোগ হয় নতুন মাত্রা।

পরিচিত বাংলা গানের পর এমন আন্তর্জাতিক রক সংগীতের পরিবেশনা শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়। বাপ্পার সংগীতচর্চার ব্যাপ্তি এবং ভিন্ন ধারার গানের প্রতি তাঁর আগ্রহও এই অংশে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই মঞ্চে রবীন্দ্রসংগীত, বাংলা আধুনিক গান এবং পিংক ফ্লয়েডের মতো ব্যান্ডের গান—বৈচিত্র্যপূর্ণ এই আয়োজন দেখিয়েছে, একজন শিল্পীর সংগীতভুবন কতটা বিস্তৃত হতে পারে।

বাংলা গানের শ্রোতাদের একটি বড় অংশের কাছে বাপ্পা মজুমদার পরিচিত তাঁর নিজস্ব সুর, কণ্ঠ ও গায়কির জন্য। তবে এমন পরিবেশনা তাঁর সংগীতরুচির অন্য দিকটিও সামনে নিয়ে আসে। শ্রোতাদের জন্য এটি ছিল পরিচিত গানের আবেগের পাশাপাশি ভিন্ন ধারার সংগীত উপভোগের সুযোগ।

সবশেষে আসে ‘বাজি’। রাত তখন অনেক। শেষ গান শুরুর আগে বাপ্পা মঞ্চে ডেকে নেন অনুষ্ঠানের যন্ত্রসংগীতশিল্পী ও ব্যাকিং ভোকালিস্টদের। তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন শ্রোতাদের, জানান কৃতজ্ঞতা। পুরো আয়োজনজুড়ে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন ব্যাকিং ভোকালিস্ট শাওন গানওয়ালা, সাইফ ও অন্তরা। তাঁদের কণ্ঠের সংগত এবং যন্ত্রশিল্পীদের পরিবেশনাও কনসার্টের সংগীতায়োজনে আলাদা মাত্রা যোগ করে।

একটি বড় কনসার্ট কেবল প্রধান শিল্পীর পরিবেশনার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে থাকে সংগীত পরিচালনা, যন্ত্রশিল্পীদের সমন্বয়, কণ্ঠের সংগত, মঞ্চসজ্জা, শব্দব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আয়োজনের পরিকল্পনা। ‘মুনলাইট মেলোডিজে’ এসব উপাদানের সম্মিলিত উপস্থিতি দর্শকদের অভিজ্ঞতাকে পূর্ণতা দিয়েছে।

একই ছাদের নিচে তিন প্রজন্মের শ্রোতা

মিলনায়তনের দর্শকসারিতে চোখ রাখলে বাপ্পার গানের জনপ্রিয়তার আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ছিলেন কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণী, কর্মজীবী মানুষ, মধ্যবয়সী শ্রোতা এবং ষাটোর্ধ্ব সংগীতপ্রেমী। কেউ এসেছেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। বয়সের এই বৈচিত্র্য বলে দিচ্ছিল, তাঁর গান কোনো একটি প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

একসময় যাঁরা কৈশোরে বাপ্পার গান শুনতে ক্যাসেট সংগ্রহ করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন জীবনের অন্য পর্যায়ে পৌঁছেছেন। তাঁদের পাশে বসেই নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা গাইছেন একই গান। সময়ের ব্যবধান থাকলেও সুরের পরিচিতি তাঁদের এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কনসার্ট দেখতে এসেছিলেন একসময়ের মডেল লামিয়া তাবাসসুম চৈতী। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বাপ্পার গান শোনার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাপ্পা মজুমদার দাদার একক শো হলেই কেন বৃষ্টি হয়? বৃষ্টিও বোঝে এত সুন্দর করে আর কেউ ওকে নিয়ে গান গাইতে পারে না! অসাধারণ একটি শো।’

তাঁর মন্তব্যে কনসার্টের পরিবেশের পাশাপাশি বাপ্পার গানের সঙ্গে শ্রোতাদের আবেগের সম্পর্কও উঠে এসেছে। বৃষ্টি, সন্ধ্যা আর পরিচিত সুর—সব মিলিয়ে আয়োজনটি অনেকের কাছে নিছক বিনোদনের বাইরে ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছিল।

সংগীতশিল্পী জয় শাহরিয়ারও উপস্থিত ছিলেন দর্শকসারিতে। অনুষ্ঠান শেষে নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দারুণ একটা সময় কাটল। দুর্দান্ত প্রোডাকশন আর পারফরম্যান্স পুরো টিমের। আর বাপ্পা ভাই তো অতুলনীয়। আমার মতো যাঁরা পাঁড় ভক্ত ভাইয়ার, তাঁদের জন্য অসাধারণ একটা আয়োজন। আমরা ভাগ্যবান, বাপ্পা মজুমদার আমাদের সময়ে বাংলা গান করেছেন।’

বিনোদন অঙ্গনের আরও অনেক পরিচিত মুখ সেদিন কনসার্ট উপভোগ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাসুমা রহমান নাবিলা, সোমনূর মনির কোনাল, ফারহিন খান জয়িতা, ডি রকস্টার শুভ, পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, তানভীর খান ও জুয়েল মোর্শেদ।

ক্যাসেট থেকে স্ট্রিমিং, বদলায়নি গানের টান

বাংলা গানের শ্রোতাদের অভ্যাস গত কয়েক দশকে অনেক বদলেছে। একসময় নতুন অ্যালবামের জন্য অপেক্ষা, দোকান থেকে ক্যাসেট কেনা কিংবা প্রিয় গান রেকর্ড করে রাখার মধ্যেই ছিল সংগীত উপভোগের আনন্দ। পরে আসে সিডির যুগ। এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও স্ট্রিমিং সেবার মাধ্যমে মুহূর্তেই শোনা যায় অসংখ্য গান। গান শোনার মাধ্যম বদলেছে, বদলেছে শ্রোতাদের পছন্দ ও অভ্যাসও।

তবু প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু শিল্পীর গান সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখে। বাপ্পা মজুমদারের গান সেই ধারারই একটি উদাহরণ। তাঁর সংগীতজীবনের দীর্ঘ পথচলায় তৈরি হয়েছে এমন অনেক গান, যেগুলো একসময়কার তরুণ শ্রোতাদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আজ সেই শ্রোতাদের অনেকেই মধ্যবয়সী। তাঁদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও যখন একই গানে কণ্ঠ মেলান, তখন বোঝা যায়, গানের জনপ্রিয়তা শুধু প্রচারের মাধ্যম কিংবা সাময়িক প্রবণতার ওপর নির্ভর করে না।

‘মুনলাইট মেলোডিজ’ আয়োজনের ঘোষণা ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে আগ্রহ এবং কনসার্টে দর্শকদের উপস্থিতি সেই ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত দেয়। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর গানের জনপ্রিয়তা কতটা বিস্তৃত, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন। এই একটি আয়োজন থেকেই সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু একই মঞ্চে বিভিন্ন বয়সী মানুষের সম্মিলিত গানের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বাপ্পার সংগীত এখনো বহু শ্রোতার কাছে আবেগের জায়গা দখল করে আছে।

শুক্রবারের কনসার্টে তাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু ২৭টি গান পরিবেশন কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে মঞ্চ মাতিয়ে রাখা নয়। বড় প্রাপ্তি ছিল শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে তৈরি হওয়া সেই নিবিড় সংযোগ, যেখানে মঞ্চের মানুষটি একা গান গাইলেও শেষ পর্যন্ত পুরো মিলনায়তন হয়ে উঠেছিল তাঁর গানের সঙ্গী।

রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। কিন্তু পরিচিত সুরের রেশ, একসঙ্গে গেয়ে ওঠার আনন্দ আর বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার স্মৃতি হয়তো অনেক শ্রোতার মনে আরও দীর্ঘ সময় ধরে বাজতে থাকবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।