হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ও দুর্ধর্ষ ভাড়াটে ডাকাত চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুয়া পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে প্রবাসীদের কিংবা ব্যবসায়ীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়াই এদের মূল কৌশল। অপরাধ সংঘটনের পর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে চক্রটির সদস্যরা নিমেষেই স্থান পরিবর্তন করে বিদেশ কিংবা দেশের দূরবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলে গা ঢাকা দেয়। গোয়েন্দা নজরদারিতে উঠে এসেছে, এই চক্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একাধিক মামলার দাগি আসামি, পেশাদার অপরাধী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু চাকরিচ্যুত সদস্য।
এই চক্রের কৌশল ও অপরাধের ধরন সাধারণ ডাকাতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাগেরহাটের বাসিন্দা সৈয়দ নাসির উদ্দিন নামের এক অপরাধীর কাণ্ড দেখে খোদ গোয়েন্দারাও তাজ্জব বনে গেছেন। তিনি থাকেন ফ্রান্সে। ফ্রান্স থেকে বিমানে চেপে প্রথমে আসেন ভারতে, তারপর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে চালান বড় ধরনের ডাকাতি। সাথে নেন শ্যালক শামীমসহ আরও কয়েকজন ভাড়াটে অপরাধীকে। ডাকাতি শেষে আবার একই আকাশ ও সীমান্ত পথে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় এক স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ধরা পড়েন তিনি।
একইভাবে দ্বিমুখী জীবনযাপন করেন পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলাম। এলাকায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ‘মেসার্স কৃষি ভান্ডার’ নামে তাঁর একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সবাই তাঁকে সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে চিনলেও আড়ালে তিনি একজন পেশাদার ডাকাত। তাঁর কাছে রয়েছে পুলিশের পোশাক, হাতকড়া ও ওয়াকিটকি। সাভার, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় তিনটি ডাকাতির মামলাসহ মোট পাঁচটি মামলার এই আসামি ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় গিয়ে ভাড়ায় ডাকাতি শেষ করে আবার নিজের দোকানে এসে স্বাভাবিক ব্যবসা শুরু করেন। সম্প্রতি উত্তরা পশ্চিম এলাকায় এক ব্যবসায়ীর ১৫ লাখ টাকা লুট করার পেছনে রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম নামের এক মাফিয়া শহিদুল ও তাঁর দলকে ভাড়া করেছিল।
প্রশাসনের গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে এমন বেশ কয়েকটি ভাড়াটে অপরাধী গ্রুপের নাম। এদের মধ্যে আল আমীন গ্রুপ, শাওন গ্রুপ ও ডিবির সাবেক সোর্সের শহীদ গ্রুপ অন্যতম। বরিশালের খানপুর এলাকার বাসিন্দা মো. জলিল মোল্লার বিরুদ্ধেও দেশের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি ডাকাতির মামলা রয়েছে। বিমানবন্দর কেন্দ্রিক চোরাচালানের মাধ্যমে আসা স্বর্ণের বড় চালানের তথ্য পেলেই এসব চক্র কোটি টাকার চুক্তিতে মাঠে নামে, আর অন্যান্য সাধারণ অপারেশনে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় খাটেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের বিবরণ থেকে জানা যায় এদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। গত ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল সিঙ্গাপুরগামী যাত্রী কুষ্টিয়ার মো. রাশেদুল ইসলাম বিমানবন্দরে পৌঁছে বাসে উঠতেই যাত্রীবেশী ডাকাতেরা তাঁর চোখ-মুখ বেঁধে বেধড়ক মারধর করে টাকা-পয়সা ও মালামাল লুট করে জসিমউদ্দীন গোলচত্বরে ফেলে রেখে যায়।
ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. ইলিয়াস কবির এবং এসআরবি-র আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, অপরাধীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে কৌশল ও স্থান পরিবর্তন করে অপরাধ ঘটিয়ে দ্রুত ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে তারা আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, যৌথ টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার থাকায় বর্তমানে এই ধরনের অপরাধ অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।


