হয়রানির প্রতিবাদে দুই দিন বন্ধ থাকবে এলপিজি বিক্রি

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের ওপর কথিত প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ এবং সরবরাহব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের সব এলপি গ্যাসের দোকান বন্ধ রাখার পাশাপাশি সরবরাহ কার্যক্রমও স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। এতে গৃহস্থালি রান্না থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান। সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। তাঁদের অভিযোগ, এলপিজির বাজারে বিদ্যমান মূল্যসংক্রান্ত জটিলতার দায় মূল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এর ফলে তাঁরা একদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নিয়মিত অভিযান, জরিমানা ও মামলার কারণে ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে উঠছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো তাঁদের কাছে সেই নির্ধারিত দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যে সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। ফলে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনে নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে গেলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার বেশি দামে বিক্রি করলে স্থানীয় প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

সরবরাহমূল্য ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়ে ক্ষোভ

এলপিজি ব্যবসায়ীদের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে সরবরাহ পর্যায়ের দাম এবং ভোক্তা পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে ব্যবধান। তাঁদের বক্তব্য, বাজারে পণ্য সরবরাহের শুরুতেই যদি নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না থাকে, তাহলে খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষে সেই মূল্য মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন।

সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনে নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হয়। আর ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশি দামে বিক্রি করতে গেলে জরিমানা ও কারাবাসের ঝুঁকিতে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগের সমাধান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে মূল্যসংক্রান্ত অনিয়ম থাকলে তার উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের দোকানে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমদানিকারক, বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশক পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তবে ব্যবসায়ীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলোর বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে সরবরাহ পর্যায়ে ঠিক কী কারণে মূল্যবৈষম্য তৈরি হচ্ছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ৪ অক্টোবর এলপিজির দাম সমন্বয় করে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দাম অনুযায়ী সিলিন্ডার কেনাবেচা হচ্ছে না। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে।

বিবরণ পরিমাণ
সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের তারিখ ৪ অক্টোবর
১২ কেজি সিলিন্ডারের আগের দাম ১,৫৮৫ টাকা
দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা
নতুন নির্ধারিত দাম ১,৮৩৭ টাকা
অভিযোগ অনুযায়ী বাজারদরের নিম্নসীমা ১,৯০০ টাকা
অভিযোগ অনুযায়ী বাজারদরের উচ্চসীমা ২,০০০ টাকার বেশি
১,৯০০ টাকা দরে অতিরিক্ত মূল্য অন্তত ৬৩ টাকা
২,০০০ টাকা দরে অতিরিক্ত মূল্য অন্তত ১৬৩ টাকা
ধর্মঘট শুরুর তারিখ ১৫ অক্টোবর
ধর্মঘটের শেষ দিন ১৬ অক্টোবর
কর্মসূচির মেয়াদ ২ দিন

দ্রষ্টব্য: আগের দামটি নতুন নির্ধারিত দাম থেকে ঘোষিত ২৫২ টাকা বৃদ্ধির অঙ্ক বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়েছে। বাজারদরের পরিসংখ্যান ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অভিযোগভিত্তিক; এটি দেশের সব বিক্রয়কেন্দ্রের যাচাইকৃত মূল্যতালিকা নয়।

ভোগান্তির আশঙ্কায় সাধারণ ক্রেতারা

বাংলাদেশের বহু পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ নেই, সেখানে সিলিন্ডার গ্যাস দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য জ্বালানি। রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নিয়মিত এলপিজি ব্যবহার করে।

এ অবস্থায় টানা দুই দিন বিক্রি বন্ধ থাকলে নতুন সিলিন্ডার কেনার প্রয়োজন রয়েছে—এমন পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়তে পারে। আগে থেকে মজুত থাকা সিলিন্ডার দিয়ে কেউ সাময়িকভাবে প্রয়োজন মেটাতে পারলেও দীর্ঘ সরবরাহবিঘ্ন হলে ভোগান্তি বাড়তে পারে। তবে ধর্মঘটের কারণে প্রকৃত সরবরাহ কতটা ব্যাহত হবে, তা নির্ভর করবে কতসংখ্যক ব্যবসায়ী কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং বিদ্যমান মজুতের ওপর।

ভোক্তাদের অভিযোগ, দাম সমন্বয়ের পর অনেক সময় নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের আশঙ্কা, সরবরাহ কমে গেলে বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায়ের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তবে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তদন্ত বা যাচাই করা তথ্য ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

সমাধানের দাবি ব্যবসায়ীদের

ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, তাঁদের মূল দাবি কেবল অভিযান বন্ধ করা নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা। আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো কোন দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করছে, পরিবেশক পর্যায়ে কীভাবে মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে এবং খুচরা পর্যায়ে কেন অতিরিক্ত দাম দিতে হচ্ছে—এসব বিষয় পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হলে একদিকে যেমন নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া হলে তার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ী পক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিক হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার।

ব্যবসায়ী নেতাদের হুঁশিয়ারি, ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের কর্মসূচির মধ্যেও তাঁদের দাবি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। দ্রুত সমঝোতা না হলে এর প্রভাব শুধু এলপিজি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রান্নার জ্বালানির নিয়মিত সরবরাহ এবং সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।