গাজীপুর সদর উপজেলার মেম্বার বাড়ি এলাকায় এএমসি নীট কম্পোজিট লিমিটেড কারখানায় লে-অফ ঘোষণার প্রতিবাদে এবং কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকেরা। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে তাঁদের এ কর্মসূচির কারণে মহাসড়কের ময়মনসিংহগামী লেনে প্রায় ২০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের দাবি সমাধানের আশ্বাস দিলে তাঁরা সড়ক থেকে সরে যান। এরপর ওই লেনে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে শ্রমিকদের এই বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। তাঁদের অভিযোগ, হঠাৎ করে লে-অফ ঘোষণা করায় তাঁরা আর্থিক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। একই সঙ্গে কারখানাটি কবে চালু হবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য না পাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকেরা কারখানার সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁরা মেম্বার বাড়ি এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ময়মনসিংহগামী লেনে অবস্থান নেন। এ সময় তাঁরা কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে স্লোগান দেন এবং সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে মহাসড়কের ওই লেনে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে সালনা হাইওয়ে থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। তাঁদের দাবির বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়ার পর শ্রমিকেরা অবরোধ তুলে নেন।
সালনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাহাবুর রহমান বলেন, সোমবার সকালে মেম্বার বাড়ি এলাকায় শ্রমিকেরা অল্প সময়ের জন্য মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় বড় ধরনের যানজট বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি বলে জানান তিনি।
লে-অফের পেছনে উৎপাদনসংকট ও বয়লারের সমস্যা
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, পর্যাপ্ত উৎপাদনকাজ না থাকা এবং বয়লারের সমস্যার কারণে গত ১০ অক্টোবর থেকে এএমসি নীট কম্পোজিট লিমিটেডের গার্মেন্টস ও কাটিং বিভাগের (ইউনিট-২) প্রায় ৫৮৫ জন শ্রমিকের জন্য লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে। উৎপাদনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা ও কারিগরি সমস্যার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে লে-অফ ঘোষণার প্রক্রিয়া এবং এর ফলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাঁদের হঠাৎ করে দুই দিনের ছুটি দেওয়া হয়। পরে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) কারখানার সামনে লে-অফ ঘোষণার নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, লে-অফ ঘোষণার আগে তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তাঁদের পাওনা, কাজ বন্ধ থাকার সময় আর্থিক সুবিধা কিংবা ভবিষ্যতে কর্মস্থলে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কোনো বক্তব্যও দেওয়া হয়নি। ফলে কী পরিস্থিতিতে তাঁদের কাজ বন্ধ হলো এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
কর্মসংস্থান ও সংসারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকেরা জানান, কারখানাটি আবার চালু হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় তাঁরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। বর্তমান কর্মস্থল চালুর অপেক্ষায় থাকবেন, নাকি অন্য কোনো কারখানায় চাকরি খুঁজবেন—এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
তাঁদের মতে, কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও সংসারের ব্যয় থেমে থাকে না। ঘরভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে নিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, সোমবার সকালে তাঁরা কারখানার প্রধান ফটকের পাশে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় কিছু লোকজন ও কারখানার ঝুট ব্যবসায়ীরা তাঁদের বাধা দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাঁরা কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে মহাসড়কে অবস্থান নেন।
শ্রমিকেরা দ্রুত কারখানাটি খুলে দিয়ে তাঁদের কাজে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে লে-অফের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং কর্মসংস্থান ও পাওনার বিষয়গুলোতে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত তথ্য চান তাঁরা।
শ্রমিকদের এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান কত দ্রুত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রায় ৫৮৫ জন শ্রমিকের কাজ বন্ধ থাকায় তাঁদের আয় ও পারিবারিক জীবনে এর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও উদ্বেগের বিষয়।
এদিকে, পুলিশের হস্তক্ষেপে সোমবারের অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে কারখানা চালুর বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা কাটবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।


