খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক কোন্দলকে কেন্দ্র করে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার ও নারী-শিশুর ওপর চরম সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক ধস প্রতিফলিত হচ্ছে। অপরাধ দমনে সরকারের নানা সদিচ্ছা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নয়ন ঘটছে না। মাঠপর্যায়ের অপরাধচিত্র এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একই উদ্বেগের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি নৃশংস ঘটনা অপরাধের ভিন্ন ভিন্ন রূপ সামনে এনেছে। গত ১১ অক্টোবর রাতে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগে চার টুকরো করা অবস্থায় শিরিন বেগম নামের এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামী দুলাল হাওলাদার তাকে হত্যা করে বলে পুলিশ জানায়। এর একদিন পর, ১৩ অক্টোবর ভোরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সুফিয়া আক্তার নিশি নামের আরেক নারী নিজ স্বামীর হাতে গলা কেটে নৃশংসভাবে খুন হন। হত্যার পর অভিযুক্ত নিজেই জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে দায় স্বীকার করে। এছাড়া ১১ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে অন্তঃসত্ত্বা সীমা রানী দাসকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তার স্বামীকে আটক করা হয়। এসব ঘটনা স্পষ্ট করে যে, নারীদের জন্য ঘরের ভেতরের পরিবেশও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঘরোয়া সহিংসতার পাশাপাশি বাইরের জীবনের নিরাপত্তাহীনতাও প্রকট। কুমিল্লার লালমাইয়ে এক সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে এক অটোরিকশাচালক। অন্যদিকে, ১১ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে যাত্রীবেশে উঠে অটোরিকশাচালক রাজন মিয়াকে গলা কেটে হত্যা করে গাড়িটি ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন একাধিক মামলার আসামি সাহেব আলী, যা অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অস্ত্র ব্যবহারের ভয়াবহতা উন্মোচন করে।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে এই সময়ের মধ্যকার সহিংসতা ও অপরাধের যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক:
| অপরাধ ও সহিংসতার ধরন | ঘটনা ও হতাহতের পরিসংখ্যান |
| রাজনৈতিক সহিংসতা | ১৮৩টি ঘটনা (১৭ জন নিহত, ১,২২৭ জন আহত) |
| বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল | ৬৯টি ঘটনা (৯ জন নিহত, ৫৪০ জন আহত) |
| বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ | ৩১টি ঘটনা (১ জন নিহত) |
| বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষ | ১৬টি ঘটনা (২ জন নিহত) |
| রাজনৈতিক হামলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ | অন্তত ১৫৩টি ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কার্যালয়ে হামলা |
| মব সহিংসতা ও গণপিটুনি | ১৩৭টি ঘটনা (৫৪ জন নিহত, ১৪৫ জন আহত) |
| নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন | ৭৮৩ জন ভুক্তভোগী (২৫৩ জন ধর্ষিত, এর মধ্যে ১৫৪ জন শিশু) |
| ধর্ষণের পর হত্যা | ১২ জন নারী ও শিশু |
| পারিবারিক সহিংসতায় নারী হত্যা | ১৩৭ জন নারী নিহত |
| শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড | ১৮৯ জন শিশুর প্রাণহানি |
| পরিত্যক্ত স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধার | ২৮৫টি ঘটনায় ৩০২টি লাশ (২৯টি বস্তাবন্দি, ১৯টি গলা কাটা, ১৯টি হাত-পা বাঁধা) |
| কারাবন্দিদের মৃত্যু | ৩৭ জন বন্দি |
| আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু | ৫ জন (একজনের মৃত্যু নির্যাতনের কারণে) |
| সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি | ৮৮টি ঘটনায় ১৩৫ জন সাংবাদিক ভুক্তভোগী |
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির মাঝে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা ও তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। খুলনায় দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম ছিনতাইকারীদের আক্রমণের শিকার হওয়ার পর পুলিশ সদস্যদের রাতে একা না চলার জন্য এক বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ যাদের কাছে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে, তাদের নিজেদের সুরক্ষাতেই যখন এমন কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়, তখন সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু কঠোর পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরসহ অপরাধপ্রবণ অঞ্চলগুলোকে সন্ত্রাসমুক্ত করার পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। সেখানে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের স্থায়ী উপস্থিতি এবং সার্বিক জনআস্থা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করা হয়।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, বিগত শাসনামলে দলীয় প্রয়োজনে পুলিশকে ব্যবহারের ফলে যে পেশাগত সংকট তৈরি হয়েছিল, তা থেকে পুরোপুরি বের হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। অন্যদিকে, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, চিহ্নিত অপরাধীদের ধরতে সারাদেশে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং কেবল তিন মাসেই ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অপরাধ দমনে প্রধান বাধা হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের অভাব। অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার সুনিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তদন্ত, অভিযোগপত্র উপস্থাপন ও অপরাধীর শাস্তি বিধানের প্রতিটি ধাপে সমান মানদণ্ড বজায় রাখা না হলে অপরাধীদের পার পাওয়ার প্রবণতা থেকে যাবে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।


