একই ওষুধের দামে বিশাল ব্যবধান, ভোগান্তিতে রোগীরা

বাংলাদেশের ওষুধের বাজারে একই জেনেরিকের ওষুধের দামে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কোনো কোম্পানির একটি ট্যাবলেটের দাম ৩২ টাকা, আবার অন্য কোম্পানির একই জেনেরিকের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ টাকায়। কোথাও আবার গায়ে লেখা দামের প্রায় অর্ধেক মূল্যে বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন। ফলে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া, গুণগত মান এবং বাজার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয় এমন রোগীদের জন্য এই মূল্যবৈষম্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ কিনতে গিয়ে অনেকে বেশি অর্থ ব্যয় করছেন। আবার কেউ কেউ চিকিৎসার খরচ কমাতে একই জেনেরিকের কম দামের বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। তবে বিকল্প ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, একই জেনেরিকের নাম থাকলেও ওষুধের গুণগত মান, প্রস্তুতপ্রণালি ও অনুমোদনের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন কৌশলের কারণে দামের পার্থক্য তৈরি হয়। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ নীতিমালা ও কার্যকর নজরদারি না থাকলে রোগীদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়তেই থাকবে।

একই ওষুধের দামে চার গুণ পার্থক্য

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন বেলাল। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে লেখা একটি ট্যাবলেটের দাম ৩২ টাকা। অথচ একই জেনেরিকের ওষুধ অন্য কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ টাকায়। অর্থাৎ, একটি ট্যাবলেট কিনতে তাঁকে অন্য বিকল্পের তুলনায় চার গুণ বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের মূল্যবৈষম্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রতিদিনের ওষুধের খরচ মাসের পর মাস বহন করতে হয় বলে দামের সামান্য পার্থক্যও দীর্ঘ সময়ে বড় ব্যয়ে পরিণত হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোগী জানতে চান, একই জেনেরিকের ওষুধের দাম এত আলাদা হওয়ার কারণ কী। বেশি দাম দিয়ে কেনা ওষুধ কি বেশি কার্যকর, নাকি ব্র্যান্ডের পরিচিতি ও বিপণন ব্যয়ই মূলত এই ব্যবধানের পেছনে কাজ করছে?

ডেলটা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেনের দাবি, বাংলাদেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানি প্রায় একই ধরনের উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। আলোচনায় থাকা ওষুধটি তাঁদের রপ্তানিযোগ্য পণ্য বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও ওষুধ রপ্তানি করে।

তবে একই জেনেরিকের ওষুধের দাম নির্ধারণে কাঁচামালের উৎসের পাশাপাশি উৎপাদনপ্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ এবং অন্যান্য ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে ব্র্যান্ডিং

ওষুধশিল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের দামের পার্থক্যের অন্যতম কারণ ব্র্যান্ডিং। একটি পণ্যের পরিচিতি তৈরি, প্রচারণা এবং বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে কোম্পানিগুলো যে ব্যয় করে, তা পণ্যের বিক্রয়মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

ওষুধশিল্প সমিতির সহসভাপতি ও রেনাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার কবির বলেন, ওষুধের দাম বেশি হওয়ার পেছনে ব্র্যান্ডিং একটি প্রধান কারণ। মুক্তবাজারে বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন মূল্যপার্থক্য থাকে, ওষুধের ক্ষেত্রেও তেমনটি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তাঁর মতে, কাঁচামাল কোন দেশ থেকে এসেছে, শুধু সেই বিষয় দিয়ে ওষুধের দামের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। ইউরোপ থেকে কাঁচামাল আনার মতো দাবিও অনেক সময় প্রচারণার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ওষুধশিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানের নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।

তবে ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে মূল্যপার্থক্য তৈরি হওয়া সম্ভব হলেও একই জেনেরিকের ওষুধের দাম দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত আলাদা হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে রোগীদের যখন দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়, তখন এই ব্যবধান তাঁদের চিকিৎসার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

গায়ে লেখা দামের প্রায় অর্ধেকে বিক্রি হচ্ছে ইনজেকশন

ওষুধের বাজারে মূল্যবৈষম্যের আরেকটি উদাহরণ মেরোপেনাম ইনজেকশন। এটি একটি অ্যান্টিবায়োটিক, যা বিভিন্ন গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইনজেকশনটির গায়ে লেখা মূল্য ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ রাজধানীর শাহবাগ এলাকার একটি ফার্মেসিতে এটি বিক্রি হচ্ছিল ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ, গায়ে লেখা দামের তুলনায় বিক্রয়মূল্য অনেক কম।

এই ব্যবধানের কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কম দামে বিক্রি হলেই কোনো ওষুধের গুণগত মান খারাপ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একইভাবে, বেশি দাম হলেই ওষুধটি উন্নত মানের, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

কোনো ওষুধ কেন কম দামে বিক্রি হচ্ছে, তা বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের অনুমোদিত মূল্য, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিক্রয়প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ওষুধটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না এবং এর মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা বিশেষভাবে জরুরি। শুধু দাম কম বলে নিজে থেকে ওষুধ পরিবর্তন করা বা চিকিৎসার নির্ধারিত নিয়ম থেকে সরে আসা উচিত নয়।

ওষুধ প্রশাসনের বক্তব্য, প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা

ওষুধের দামের পার্থক্য নিয়ে ওষুধ প্রশাসনের বক্তব্য, কম দামের ওষুধ মানেই নিম্নমানের নয়। বাজারে ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নজরদারি করা হয় বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

ওষুধ প্রশাসনের পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, একই জেনেরিকের বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের দামের পার্থক্য কখনো এত বেশি হয় যে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কম দামে বিক্রি হওয়া ওষুধের মান খারাপ—এমন ধারণা সঠিক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, ওষুধ যে দামেই বিক্রি হোক না কেন, গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি রয়েছে। তবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আস্থা থাকে।

এই বক্তব্য ওষুধের বাজারে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে। উৎপাদন ব্যয়, বিপণন খরচ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা এবং কোম্পানির যৌক্তিক ব্যবসায়িক আয়—এসব বিষয় কীভাবে ওষুধের দামে প্রতিফলিত হবে, তা স্পষ্ট থাকা জরুরি।

কার্যকর নীতিমালা থাকলে অস্বাভাবিক মূল্যপার্থক্য শনাক্ত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে রোগীরা তাঁদের প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন।

চিকিৎসকদের উপঢৌকন দেওয়া নিয়েও উদ্বেগ

ওষুধের মূল্যবৈষম্যের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের একাংশের মতে, ওষুধ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের উপঢৌকন দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ধরনের সুবিধা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলোর চিকিৎসকদের উপঢৌকন দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। চিকিৎসকদেরও এ ধরনের উপঢৌকন গ্রহণ করা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের ব্র্যান্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসাগত প্রয়োজন, ওষুধের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং সামর্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেন চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে, সে জন্য পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশ মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের কার্যকারিতায় সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। তবে ওষুধের মূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। তাঁর মতে, ওষুধের দামকে নীতিমালার আওতায় আনা সরকারের দায়িত্ব।

রোগীদের স্বার্থে দরকার স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা

ওষুধ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান উপকরণ। তাই এর মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়। একই ওষুধের দামে বড় ব্যবধান থাকলে তাঁদের চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে উৎপাদন ব্যয়, গুণগত মান বজায় রাখার খরচ, বাজারজাতকরণ এবং যৌক্তিক মুনাফার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুমোদিত মূল্য যাচাই, বাজার তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে নজরদারি আরও কার্যকর করা দরকার।

রোগীদেরও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু কম দামের কারণে একটি ওষুধের পরিবর্তে অন্যটি ব্যবহার করা উচিত নয়। একই জেনেরিকের বিকল্প ওষুধ সম্পর্কে জানতে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। এতে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিদের দাবি, ব্র্যান্ডিংসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কারণে দামের পার্থক্য তৈরি হয় এবং কম দামের ওষুধ মানেই নিম্নমানের নয়। ওষুধ প্রশাসনও গুণগত মান নিশ্চিত করতে নজরদারির কথা বলছে। কিন্তু একই জেনেরিকের ওষুধের দাম কেন কয়েক গুণ পর্যন্ত আলাদা হবে, তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

রোগীদের স্বার্থ রক্ষায় এমন একটি মূল্যব্যবস্থা দরকার, যেখানে ওষুধের মান, দাম নির্ধারণের ভিত্তি এবং বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকবে। কারণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে একজন রোগীকে যেন অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান বিবেচনা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।