চট্টগ্রামে এক সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রকাশিত হয়েছে সংগীতশিল্পী শুভ দাস ও সমসাময়িক কণ্ঠশিল্পী ঐশী রক্ষিতের নতুন পূজার গান ‘আগমনী’র আলপনা’। বাংলা গানের ঐতিহ্য, মৌলিক সংগীতচর্চা এবং সংস্কৃতির বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গানটির প্রকাশনার পাশাপাশি সংগীতের সামাজিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে গানটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সোমেশ্বর নৃত্যালয়ের আয়োজনে এতে অংশ নেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সংগীতশিল্পী, লেখক, সাংবাদিক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। সংগীত পরিবেশনা, নৃত্য এবং আলোচনা মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে বাংলা সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরার একটি আয়োজন।
শুভ দাস জি বাংলার সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘সা রে গা মা পা’-তে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন। অন্যদিকে, ঐশী রক্ষিত সমসাময়িক সংগীতের একজন কণ্ঠশিল্পী। তাঁদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘আগমনী’র আলপনা’ পূজাকে কেন্দ্র করে তৈরি নতুন বাংলা গানের তালিকায় যুক্ত হলো।
গানটির কথা লিখেছেন ডা. অম্বরীশ মিত্র। সুর করেছেন শুভ দাস। সংগীতায়োজনের দায়িত্বে ছিলেন মালয় কুমার ইন্দু মুখেশ ও অনুজিৎ বড়ুয়া লিমন। গীতিকারের লেখা, সুরকারের সুর এবং সংগীতায়োজকদের সম্মিলিত কাজের মধ্য দিয়ে গানটি শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শুভ দাস ও ঐশী রক্ষিত দুজনই সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁদের পরিবেশনার পাশাপাশি সোমেশ্বর নৃত্যালয়ের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। ফলে গান প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে পুরো আয়োজনেই সংগীত ও নৃত্যের সমন্বিত উপস্থিতি দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী এবং আজিম গ্রুপের পরিচালক অনুপ বরন দাশ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাকর সন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সংগীতশিল্পী রিয়াজ ওয়ায়েজ। শুভ দাসও অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতি ও ভাবনা তুলে ধরেন।
শ্রুতিশিখার উপস্থাপনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন আবৃত্তিশিল্পী কনকন দাস। স্বাগত বক্তব্য দেন সোমেশ্বর নৃত্যালয়ের পরিচালক সুকান্ত চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
গান প্রকাশের পাশাপাশি সংগীতের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনাও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বক্তারা বলেন, সংগীত মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলতে পারে। গানের কথা ও সুরের মাধ্যমে নতুন ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সামাজিক অসংগতির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার সুযোগ রয়েছে। শ্রোতারা যখন গানের বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান, তখন সেই গান তাঁদের ভাবনায়ও পরিবর্তন আনতে পারে।
আলোচনায় বাংলা সংগীতের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও তার স্থায়ী জনপ্রিয়তার বিষয়টিও উঠে আসে। সময়ের সঙ্গে মানুষের গান শোনার অভ্যাস এবং সংগীত উপভোগের মাধ্যম বদলেছে। তারপরও বহু বছর আগে সৃষ্টি হওয়া গান এখনো শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে। বক্তারা মনে করেন, এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মৌলিক বাংলা গান তৈরিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলা গানের সমৃদ্ধ ভান্ডার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও বাড়ানো দরকার।
বাংলা সংস্কৃতিতে পূজার গান একটি পরিচিত ধারা। বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে ঘিরে আগমনী সংগীতের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আগমন, শরতের আবহ এবং উৎসবের প্রত্যাশা প্রকাশ পায়। এসব গানে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও আবেগেরও প্রতিফলন ঘটে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এই ধারায় নতুন গান যুক্ত হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী সংগীতচর্চার পাশাপাশি সমসাময়িক শিল্পীদের সৃজনশীলতারও সুযোগ তৈরি হয়।
চট্টগ্রামের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘আগমনী’র আলপনা’ প্রকাশের পাশাপাশি মৌলিক বাংলা গানকে উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এ ধরনের অনুষ্ঠান শিল্পীদের নিজেদের কাজ তুলে ধরার সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে সংগীত, নৃত্য ও আলোচনার সমন্বয় দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে সহায়তা করে।
নতুন গান প্রকাশের এই আয়োজন তাই কেবল একটি সংগীত পরিবেশনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বাংলা গানের ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুন সৃষ্টিকে সামনে আনার একটি প্রচেষ্টাও ছিল। শুভ দাস ও ঐশী রক্ষিতের অংশগ্রহণে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি মৌলিক বাংলা সংগীতের চর্চা এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগের গুরুত্বকে নতুন করে তুলে ধরেছে।


