বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ‘জিয়া পরিষদ’-এর সভাপতি হিসেবে পরিচিত মো. আল-আমিনের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ ১২টি অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সংস্থাটির কর্তৃপক্ষ। অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা কেন নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
বিএডিসির শোকজ নোটিশে উল্লেখ করা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) কাজে হস্তক্ষেপ, কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি, দরপত্র মূল্যায়নে ব্যবহৃত ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া, দাপ্তরিক এলাকায় বহিরাগত ব্যক্তিদের ডেকে আনা, কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া এবং সরকারি নথি ছুড়ে মারার মতো ঘটনা। এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, কৈফিয়ত তলবের চিঠি ছিঁড়ে ফেলা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
দরপত্র মূল্যায়নে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
নোটিশ অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর MIEFP প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রম চলাকালে কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে আপত্তি তোলেন আল-আমিন। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পদত্যাগের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় দরপত্র মূল্যায়নের কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া এবং দাপ্তরিক এলাকায় বহিরাগত ব্যক্তিদের ডেকে আনার অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির দায়িত্ব, নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। তাই দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রমে অনিয়ম বা অননুমোদিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে আল-আমিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন।
অডিট নিয়ে বিরোধ, নথি ছুড়ে মারার অভিযোগ
শোকজ নোটিশে গত ৩০ জুন অডিট-সংক্রান্ত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আল-আমিনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, হুমকি দেওয়া এবং দাপ্তরিক নথি ছুড়ে মারার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া গত ৩০ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দাপ্তরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা চাকরিবিধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, আল-আমিনের বিরুদ্ধে বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন এবং বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষের দাবি
বিএডিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত তিনজন ব্যক্তি অগ্রদূতকে জানিয়েছেন, আল-আমিনের কথিত ঔদ্ধত্য ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকারের যথাযথ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের নিয়মিত নজরদারি থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের এসব বক্তব্য তাঁদের নিজস্ব দাবি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ছাড়া এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
অগ্রদূতের পক্ষ থেকে আল-আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে যুক্তিসংগত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএডিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও জিয়া পরিষদের মহাসচিব খান ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে আমি ক্লিয়ার কিছু জানি না।”
বিএডিসির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব আজিজুল ইসলাম এবং সংস্থাটির সচিব আবু জাফর রাশেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের ফোনে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বিভাগীয় তদন্তেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপ
বিএডিসির শোকজ নোটিশে ১৯৯০ সালের বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট বিধির উল্লেখ রয়েছে। নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে আল-আমিনের লিখিত জবাব, অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ এবং বিভাগীয় কার্যক্রমের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ, প্রমাণ যাচাই এবং প্রযোজ্য চাকরিবিধি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিএডিসি দেশের কৃষি উন্নয়ন ও কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা সহজ হয়।
আল-আমিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১২টি অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তে কী উঠে আসে এবং কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা এখন দেখার বিষয়। অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এ বিষয়ে বিএডিসি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি জানা গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।


