বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গ্রেফতার ও উদ্ধার অভিযানের তথ্য জানানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টা থেকে রাত ৩টার মধ্যে মিরসরাই উপজেলার ১৫ নম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার শেখের তালুকে এ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে তারা।
ডাকাতরা বাড়ির মালিক মতিন উল্লাহকে মারধর করে তাঁর হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলে। একই সময়ে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আটকে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যদের এভাবে জিম্মি করে ডাকাত দলের সদস্যরা বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালায়।
একপর্যায়ে তারা আলমারি, ওয়ারড্রোব ও আসবাবপত্র তছনছ করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন, সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটর, ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার (ডিভিআর), সিপিইউসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, লুণ্ঠিত মালামালের আনুমানিক মূল্য ১৬ লাখ ৪০ হাজার ১৫০ টাকা।
ডাকাতরা চলে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীরা প্রতিবেশীদের সহায়তায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে মিরসরাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করে।
ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে অভিযান
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের নির্দেশে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও মিরসরাই থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লার তিতাসের মো. রহিম, বরুড়ার মো. জামাল প্রকাশ কুদ্দুস, দাউদকান্দির মো. সাইফুল ইসলাম প্রকাশ সজিব, লাকসামের মো. আনোয়ার হোসেন মিলন এবং একই উপজেলার মো. হানিফ।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন অপরাধে মামলা রয়েছে। রহিমের বিরুদ্ধে চুরি, অস্ত্র, হত্যা ও ডাকাতিসহ ১০টি মামলা রয়েছে। জামালের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে চারটি মামলা এবং সাইফুলের বিরুদ্ধে ডাকাতির দুটি মামলা রয়েছে। হানিফের বিরুদ্ধে ডাকাতির চেষ্টার একটি মামলা রয়েছে। তবে আনোয়ার হোসেন মিলনের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অস্ত্র, ট্রাক ও সিসিটিভির সরঞ্জাম উদ্ধার
গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি এলজি, চার রাউন্ড কার্তুজ, দুটি বড় ছোরা, একটি ট্রাক, সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ডিভিআর ও মনিটর, একটি সিপিইউ এবং একটি ভাঙা তালা।
উদ্ধার হওয়া এসব সামগ্রী ডাকাতির ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে সিসিটিভির সরঞ্জাম এবং ডাকাতিতে ব্যবহৃত ট্রাকের সূত্র ধরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করা ও লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা একটি আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য বলে তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত একাধিক সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। তবে এসব ঘটনায় তাঁদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
অবসরের অর্থের তথ্য পেয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অবসরে যাওয়ার পর মতিন উল্লাহ পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধা বাবদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বাড়িতে নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া যেতে পারে, এমন ধারণা থেকেই ডাকাতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার এবং ডাকাত দলের অন্যান্য অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটনে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
তবে গ্রেফতার পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে পলাতক ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং ডাকাতির ঘটনায় লুণ্ঠিত সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিশ্চিত করাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


