জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সব সাংগঠনিক পদ ও দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) মো. আবদুর রহমান। দলটি তার প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনা ও ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে সরে গেছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠনের পর দলটির অভ্যন্তরে আদর্শিক পরিবর্তন ঘটেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এনসিপির আহ্বায়কের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন আবদুর রহমান। পরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পদত্যাগপত্রটি প্রকাশ করে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
পদত্যাগপত্রে আবদুর রহমান উল্লেখ করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় নাগরিক কমিটির মাধ্যমে এনসিপি গঠনের উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন। সে সময় একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের চর্চা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশা তাকে দলটির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনের পর দলের অবস্থান তাকে হতাশ করেছে।
তার অভিযোগ, নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রক্রিয়ায় এনসিপির সাংগঠনিক ও আদর্শিক চরিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর আদর্শের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
আবদুর রহমানের ভাষ্য, রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কোনো দলের সঙ্গে নির্বাচনী বা কৌশলগত সমঝোতা হতে পারে। তবে সেই সমঝোতা যেন আদর্শিক ঐক্যে পরিণত না হয়, এমন প্রত্যাশা নিয়েই তিনি এনসিপিতে ছিলেন। বাস্তবে রাজনৈতিক জোটটি আদর্শিক জোটে রূপ নিয়েছে বলে তার অভিযোগ। এ পরিস্থিতিতে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
পদত্যাগপত্রে জামায়াতকে ঘিরে দলের অভ্যন্তরে দ্বিচারিতার অভিযোগও তুলেছেন এই নেতা। তার দাবি, এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে যুক্ত অনেক মেধাবী ও সম্ভাবনাময় নেতাকর্মী ইতিমধ্যে দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শিক পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইতিহাস নিয়ে মতপ্রকাশের কারণে সহকর্মীদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন আবদুর রহমান। তার দাবি, ইতিহাস সম্পর্কে নিজের মতামত প্রকাশ করায় তাকে ‘মুজিববাদী’ তকমা দেওয়া হয়েছে। তার মতে, ভিন্নমতকে এভাবে চিহ্নিত করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মুক্তভাবে মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থী।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাসনামলের মূল্যায়নকে পৃথকভাবে দেখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে স্বাধীনতার পর কোনো রাজনৈতিক দলের শাসন বা কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নকে এক করে দেখা উচিত নয়। কিন্তু এনসিপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের অবস্থান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে জামায়াত-শিবিরের বক্তব্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এতে দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তার দাবি।
এসব কারণেই আদর্শ ও নৈতিকতার প্রশ্নে এনসিপির সঙ্গে আর পথচলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আবদুর রহমান। পদত্যাগপত্রে তিনি তার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার অনুরোধ করেছেন। তবে দলের প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকলেও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এনসিপি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ছাত্রলীগ থেকে এনসিপি, রাজনৈতিক পথচলায় পরিবর্তন
আবদুর রহমানের রাজনৈতিক পথচলায় একাধিক পর্যায় রয়েছে। এনসিপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রলীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন। ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় বর্ধিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।
তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। অভ্যুত্থানের পর তিনি এনসিপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে দলটিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে তার পদত্যাগপত্রের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায়ও তার নাম ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির জোট গঠনের প্রেক্ষাপটে তিনি মনোনয়ন পাননি। এই রাজনৈতিক সমীকরণ তার দলত্যাগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে তার পদত্যাগপত্রে সরাসরি কোনো একক কারণ নির্দিষ্ট করা না হলেও জোটের আদর্শিক প্রভাব নিয়ে তার অসন্তোষ স্পষ্ট।
আবদুর রহমানের পদত্যাগ এনসিপির অভ্যন্তরীণ আদর্শিক অবস্থান, রাজনৈতিক জোটের কৌশল এবং দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে তার উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনসিপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে দলটির নেতৃত্ব এসব অভিযোগের কী ব্যাখ্যা দেয় এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জোট ও আদর্শিক অবস্থানের প্রশ্নে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


