গত ৭ অক্টোবর রাতে উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতে একই গ্রামের একটি মাদ্রাসার মাঠে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিল কিশোরীটি। পথে দুর্বৃত্তরা তার মুখ চেপে ধরে একটি অটোরিকশায় তুলে নেয়। পরে তাকে নদীর তীরবর্তী নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে জাকির, নাঈম ও সোহাগ নামের তিন ব্যক্তি কিশোরীটিকে ধর্ষণ করে। অন্য কয়েকজনও তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে দুর্বৃত্তরা তাকে বাড়ির পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। এ সময় কাউকে ঘটনাটি জানালে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
শারীরিক অবস্থার অবনতি, তিন দিন পর মুখ খোলে কিশোরী
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ঘটনার পর ভয়ে কিশোরীটি প্রথমে কাউকে কিছু জানায়নি। পরদিন থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। মেয়ের অসুস্থতা দেখে মা বারবার জানতে চাইলে একপর্যায়ে ঘটনার তিন দিন পর সে নির্যাতনের কথা জানায়। এরপর বিষয়টি স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে অবহিত করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার কিশোরীটিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন স্বজনরা। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক রতন কুমার ঢালী তখন জানিয়েছিলেন, ঘটনার বেশ কয়েক দিন পর তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। ফলে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ আশঙ্কার মধ্যেও প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর স্বজনেরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে পরিবারটির জন্য।
গতকাল সোমবার বিকেলে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি ঘরের বিছানায় শুয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কিশোরীটি। সামান্য কথা বলার চেষ্টা করলেও ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে। তার এমন অবস্থা দেখে পরিবারের সদস্যরাও উদ্বেগ ও অসহায়ত্বের কথা জানান।
কিশোরীটির চাচা বলেন, তাঁর ভাই অত্যন্ত দরিদ্র ও সহজ-সরল মানুষ। একটি গরুর খামারে কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ চালান তিনি। সীমিত আয়ে সংসার চালাতেই যেখানে কষ্ট হয়, সেখানে মেয়ের চিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা, পরে মামলা
ভুক্তভোগীর চাচার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তির কাগজপত্র নিয়ে গত শনিবার তাঁরা সরাইল থানায় যান। পরে কিশোরীর মা বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলায় আসামি করা হয়েছে জাকির মিয়া (৩৩), নাঈম (২৪), সোহাগ মিয়া (২১), মোকলেস (৫২), আলামিন ওরফে জিকির (৪০) এবং বাহার মিয়াকে (২২)। তাঁদের সবার বাড়ি একই ইউনিয়নের বাড়িউড়া গ্রামে বলে জানা গেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার কথা জানার পর কিশোরীর মা স্থানীয় সর্দার রজব আলী ও হুমায়ূন মিয়াকে বিষয়টি জানান। পরে স্থানীয়ভাবে কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে দাবি করেন হুমায়ূন মিয়া।
তিনি জানান, পরদিন ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় চলে যাওয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি সরাসরি যুক্ত থাকতে পারেননি। পরে স্থানীয় মুরুব্বিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানান।
নোয়াগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আহমেদ বলেন, ঘটনা জানার পর তিনি ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা করানো এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তিনি নিজ উদ্যোগে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি বলে স্বীকার করেন।
দুই আসামি গ্রেপ্তার, বাকিদের খুঁজছে পুলিশ
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া জানান, শনিবার রাতে কিশোরীর মা ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই রাতেই বাহার মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন রোববার বিকেলে ঢাকা থেকে নাঈমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান ও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মামলা দায়ের করতে দেরি হওয়ার পেছনে স্থানীয় কেউ জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ওসি। তবে এ বিষয়ে তদন্তের ফলাফল এখনো জানা যায়নি।
মেয়ের চিকিৎসা ও ন্যায়বিচারের আকুতি
কিশোরীর বাবা বলেন, তাঁর একমাত্র মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে, যা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। যারা তাঁর মেয়ের সর্বনাশ করেছে, তাঁদের বিচার চান তিনি।
মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁরা অত্যন্ত দরিদ্র। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেই তাঁদের কষ্ট হয়। মেয়েকে হাসপাতালে রাখার সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্যও ছিল না। এ কারণেই তাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা বিপর্যয় নয়; এটি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা যেন চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
মামলার তদন্ত চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। তবে ভুক্তভোগী কিশোরীর চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তার স্বজনেরা।


