ঘটনাটি গত সেপ্টেম্বরের। পর্তুগালের নেশন্স লিগের জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ৪১ বছর বয়সী এই অধিনায়ক। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ না পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, ১ অক্টোবর ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচেও তাঁকে প্রথম একাদশে রাখা হবে না। এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে চলে যান পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।
রোনালদোর এমন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পর্তুগালের ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব, কোচের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি গড়ায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলা কমিটি পর্যন্ত। সেখান থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও ২৫৫ ইউরো জরিমানার সিদ্ধান্ত আসে।
কোচের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ
জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রোনালদো অভিযোগ করেন, পর্তুগালের কোচ হোর্হে জেসুস তাঁর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি দুবার ভঙ্গ করেছেন। বিষয়টিকে তিনি বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবেও উল্লেখ করেন। কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ থেকেই তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
তবে রোনালদোর অভিযোগের বিপরীতে কোচ হোর্হে জেসুস তাঁর সঙ্গে কোনো চুক্তি বা বিশেষ সমঝোতা থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হলেও রোনালদোর জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
শাস্তির মেয়াদ প্রায় শেষ
রোনালদোর জন্য সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সময় গণনায় ইতোমধ্যে ১৯ দিন পার হয়ে গেছে। ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের দিন থেকেই শাস্তি কার্যকর হওয়ায় বাকি মেয়াদ শেষ হলে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে তাঁর সামনে আর কোনো নিষেধাজ্ঞাজনিত বাধা থাকার কথা নয়।
পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলা কমিটি জানিয়েছে, শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রোনালদোর অনুশোচনা, ফুটবলে তাঁর অবদান এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অর্জন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পাশাপাশি তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন ও অতীতের অবদানও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় নিজের বিভিন্ন পুরস্কার ও অর্জনের বিবরণও জমা দেন রোনালদো। এর আগে এক বিবৃতিতে তিনি নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। এমনকি নিজের আচরণের জন্য শাস্তি পাওয়ার যোগ্য বলেও স্বীকার করেন এই তারকা। তাঁর এই অবস্থান শাস্তি নির্ধারণে বিবেচিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফেডারেশনের শৃঙ্খলা কমিটি।
রোনালদোকে ফেরাতে চায় ফেডারেশন
রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে পর্তুগালের ফুটবল কর্তৃপক্ষের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনকা জাতীয় দলে এই তারকাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘রেকর্ড’-কে তিনি জানিয়েছেন, বিরোধের সমাধান হলে রোনালদোকে আবারও জাতীয় দলে ফেরাতে চায় ফেডারেশন।
এমন অবস্থান থেকে বোঝা যায়, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রোনালদোর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে চায় না পর্তুগিজ ফুটবল কর্তৃপক্ষ। তবে কোচ ও খেলোয়াড়ের মধ্যকার মতপার্থক্য কীভাবে মিটবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রোনালদো পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড়। জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন তিনি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতিও রয়েছে তাঁর দখলে। তাঁর নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে।
২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের পাশাপাশি পর্তুগালকে দুটি নেশন্স লিগের শিরোপা জিততে সহায়তা করেছেন রোনালদো। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বয়স ৪১ হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর উপস্থিতি পর্তুগালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে খেলছেন রোনালদো। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। ক্লাব ফুটবলে ব্যস্ততার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে আরও সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যও তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা রোনালদোর ক্যারিয়ারে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে আপাতত পর্তুগালের কোনো ম্যাচ মিস করতে হচ্ছে না তাঁকে। এখন কোচ ও ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কীভাবে স্বাভাবিক হয়, সেটিই হবে পর্তুগালের সমর্থকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।


