সম্পত্তির লোভ ও বিরোধে বোনকে হত্যার অভিযোগ ভাই-ভাবিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে

নওগাঁর ধামইরহাটে ধানখেত থেকে বৃদ্ধা হালিমা বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, হালিমার জমানো টাকা ও গবাদিপশুর প্রতি লোভ, মাদক বিক্রির তথ্য দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ এবং জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। গ্রেপ্তার অন্য তিনজন তাঁদের প্রতিবেশী। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছে পুলিশ।

বুধবার দুপুরে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম তাঁর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। এর আগে সোমবার সকালে ধামইরহাট উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ের পাশে ধানখেত থেকে হালিমা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত হালিমার বয়স ছিল ৬৫ বছর।

এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন হালিমার ছোট ভাই মজনু রহমান, তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা এবং একই গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম, হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেন। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়েছে। তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমান।

অভাবের মধ্যে দিন কাটত হালিমার

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বামীহীন ও নিঃসন্তান হালিমা বাবার বাড়িতে ছোট ভাই মজনু রহমানের ঘরের পেছনে একটি ছাপরা ঘরে বসবাস করতেন। মানুষের বাড়িতে কাজ করে এবং গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। নিজের পরিশ্রমে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সঞ্চয় ও গবাদিপশুর প্রতি তাঁর ছোট ভাই এবং ভাইয়ের স্ত্রীর লোভ ছিল বলে দাবি পুলিশের।

অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলামের সঙ্গে হালিমার বিরোধের পেছনে ছিল মাদক বিক্রির তথ্য দেওয়ার বিষয়টি। পুলিশ জানায়, রবিউল মাদক বিক্রি করেন—এমন তথ্য হালিমা ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্যকে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে রবিউল তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া প্রতিবেশী হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনের সঙ্গে হালিমার জমিজমা নিয়ে বিরোধ ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও আর্থিক স্বার্থ—এই কয়েকটি বিষয় একত্র হয়ে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার পেছনে ভূমিকা রাখে।

রাতে ঘর থেকে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হামিদুর কৌশলে হালিমাকে তাঁর ঘর থেকে ডেকে বের করেন। এরপর অন্য অভিযুক্তরা তাঁর মুখ চেপে ধরে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যান বলে অভিযোগ।

পুলিশের দাবি, সেখানে হালিমার হাত রশি দিয়ে বেঁধে তাঁর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর মজনুর স্ত্রী হোসনে আরা হালিমার কানে থাকা সোনার দুল খুলে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দুল খুলে নেওয়ার সময় বৃদ্ধার একটি কানের লতি কেটে যায় এবং অন্যটি ছিঁড়ে যায় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পরে মরদেহটি বাঁশঝাড়ের আড়ালে ফেলে রেখে অভিযুক্তরা চলে যান বলে পুলিশের ভাষ্য।

সোমবার সকালে স্থানীয় একটি ধানখেতের পাশ থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। পরে এ ঘটনায় হত্যা মামলা হলে তদন্তে নামে ধামইরহাট থানা-পুলিশ।

যেভাবে গ্রেপ্তার পাঁচজন

পুলিশ সুপার জানান, তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযান চালিয়ে প্রথমে মজনু রহমান ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে আলমপুর ও ছিলিমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে রবিউল ইসলাম, হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, ঘটনার বিবরণ এবং অভিযুক্তদের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। হত্যায় ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করার কথাও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তবে মামলার তদন্ত, জব্দ করা আলামতের পরীক্ষা এবং আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনো বাকি।

একজন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধার জীবনযাপন, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কীভাবে একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে গড়াল, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হালিমা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার প্রতিটি দিক নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাও জরুরি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।