বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের বুস্টার এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। বৃহস্পতিবার বিকেলে মৃত্যুর খবর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
নিহত মারুফ বেপারি ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সিড্যা গ্রামের প্রয়াত আব্দুস সোবহান বেপারির ছেলে। তিনি তিন সন্তানের বাবা। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে প্রায় ১৪ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন।
পরিবার ও স্থানীয় প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেপটাউনের বুস্টার এলাকায় একটি দোকান পরিচালনা করতেন মারুফ। সেখানে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্থানীয় একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী তাঁর কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করত। প্রতি মাসে ৫০০ দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহতের ভাতিজা কামরুজ্জামান বেপারি জানান, গত তিন মাসের মধ্যে তাঁর চাচার দোকান দুই মাস বন্ধ ছিল। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি মাত্র এক মাস খোলা থাকায় মারুফ কেবল ওই মাসের চাঁদা দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তিন মাসের পুরো টাকা দাবি করে।
এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দোকান থেকে চলে যায়। তবে কিছুক্ষণ পর তারা অস্ত্র নিয়ে ফিরে আসে এবং মারুফকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। হামলার পরপরই দুর্বৃত্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, চাঁদার দাবিতে আপত্তি জানানোর কারণেই পরিকল্পিতভাবে মারুফকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ ১৪ বছর প্রবাসে কাটানো মারুফের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তিন সন্তানকে রেখে তাঁর এমন মৃত্যু স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। পরিবারের সদস্যরা এখন দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
জানা গেছে, মারুফ বেপারির মরদেহ বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন।
এদিকে প্রবাসী ব্যবসায়ী হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
সিড্যা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান রুবেল আকন বলেন, ‘প্রবাসীরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
তিনি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ঘটনার বিষয়ে ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, নিহতের স্বজনদের কাছ থেকে তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা। একই সঙ্গে বিদেশে জীবিকার সন্ধানে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় মারুফের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটানো এই ব্যবসায়ীকে শেষবারের মতো নিজ গ্রামে ফিরিয়ে এনে দাফন করার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁর স্বজনরা।


