চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে দেশটির বার্তা সংস্থা সিনহুয়া ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির এসব তথ্য জানিয়েছে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নাগকু অঞ্চলের বাকেন এলাকায়। অঞ্চলটি তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত।
তিব্বত চীনের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে ‘তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ হিসেবে পরিচিত। অঞ্চলটির বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে উঁচু পর্বতমালা, দুর্গম উপত্যকা ও প্রত্যন্ত জনবসতি। এসব এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা, চলছে উদ্ধার অভিযান
ভূমিকম্পের পরপরই স্থানীয় প্রশাসন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়। ধসে পড়া ভবনের নিচে কেউ আটকা পড়েছেন কি না, আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে কি না এবং প্রত্যন্ত জনপদে যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা সম্ভব হচ্ছে কি না—এসব বিষয়কে সামনে রেখে উদ্ধার তৎপরতা চলছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৩৩৯টি বাড়িঘর ও আবাসিক স্থাপনা ধসে পড়েছে। অনেক স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎহীন এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রধান সড়কগুলোর কয়েকটি অংশ বন্ধ হয়ে গেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসামগ্রী ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাহাড়ি ঢালে মাটি ও পাথরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে নতুন করে ধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফলে উদ্ধারকর্মীদের একদিকে যেমন দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
কামদো ও নিংচিতেও অনুভূত কম্পন
ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রের বাইরে তিব্বতের গুরুত্বপূর্ণ শহর কামদো ও নিংচিতেও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে এসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, ভূমিকম্পের সময় ভবনগুলো তীব্রভাবে কাঁপছিল। আতঙ্কিত বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে ছুটে যেতে দেখা যায়। কিছু ভিডিওতে রাতের অন্ধকারে মানুষের ছোটাছুটির দৃশ্যও উঠে এসেছে।
তবে এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভিডিওগুলোতে দেখানো পরিস্থিতি এবং নির্দিষ্ট স্থান সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত রয়েছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নতুন দুর্যোগ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিব্বত ও বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক গতিবিধির কারণে এই অঞ্চলে ভূত্বকের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চাপ তৈরি হচ্ছে। সেই চাপের আকস্মিক মুক্তি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি শুধু ভবন ধসে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কম্পনের ফলে পাথর গড়িয়ে পড়া, পাহাড়ধস, সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় এসব সমস্যা উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানোর সময় বাড়িয়ে দেয়।
এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চীনের গানসু প্রদেশে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে ১২০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্গম ও শীতপ্রবণ এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনার চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দুই মাসেরও কম সময় আগে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে তিব্বত ও নেপালজুড়ে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে আগের ওই দুর্যোগের হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে অপেক্ষা
বর্তমান ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর পর ধসে পড়া স্থাপনা, আহত মানুষের সংখ্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ মুহূর্তে জরুরি কাজ হচ্ছে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা। বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়নে সময় লাগতে পারে। উদ্ধার অভিযান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিব্বতের এই শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


