ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এশিয়ার প্রারম্ভিক লেনদেনে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ০.২ শতাংশ কমে ১১২ দশমিক ৯৬ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ০.৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১২ ডলারে নেমে আসে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ শতাংশ বেড়েছিল। এতে মে মাসের শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় আন্তর্জাতিক বাজারে বহুল ব্যবহৃত এই জ্বালানি তেলের দাম। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে উদ্বেগ এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
শুক্রবার সামান্য দরপতন সত্ত্বেও টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো দাম বাড়ার পথে রয়েছে ব্রেন্ট ক্রুড। অন্যদিকে, ডব্লিউটিআইয়ের দাম তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কমতে পারে। দুই বেঞ্চমার্কের দামের এই ভিন্ন প্রবণতা আন্তর্জাতিক তেলবাজারের অনিশ্চিত পরিস্থিতিকেই তুলে ধরছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। দেশটিতে হুথি গোষ্ঠীর হামলার কারণে তেল উৎপাদন, পরিবহণ ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় সেখানে জ্বালানি অবকাঠামো বা সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
তেলের বাজারে শুধু প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতিই নয়, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কাও দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে সরবরাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে লেনদেন করেন। ফলে উৎপাদন বা রপ্তানি পুরোপুরি ব্যাহত হওয়ার আগেই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারসংশ্লিষ্টদের নজর রয়েছে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা এবং তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সক্ষমতার দিকে। পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দামের ওপর চাপ কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বাড়তি চাপ
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে তার প্রভাব জ্বালানি খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। উৎপাদন ও পরিবহণ খরচ বাড়লে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামেও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম একই হারে বাড়বে, এমন নয়। স্থানীয় মূল্য নির্ধারণে আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, সরকারি নীতি ও অন্যান্য বিষয়ও ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে, শুক্রবারের সামান্য দরপতন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক তেলবাজারে স্বস্তি ফেরার স্পষ্ট লক্ষণ নেই। সৌদি আরবকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা আগামী দিনগুলোতেও দামের ওঠানামা বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক থাকে, তার ওপর।


