কিছু কণ্ঠস্বর কেবল গান শোনায় না, মানুষের হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে জমে থাকা সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ আর না-পাওয়ার বেদনাকে ভাষা দেয়। কিছু শিল্পী সময়ের সীমানা পেরিয়ে হয়ে ওঠেন মানুষের একান্ত আপন। মান্না দে তেমনই এক কিংবদন্তি—যাঁর কণ্ঠে জীবনের হাসি-কান্না, ভালোবাসা, অভিমান আর নিঃসঙ্গতা খুঁজে পেয়েছে অনন্য এক সুরের ঠিকানা।
১৯১৯ সালের ১ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন প্রবোধচন্দ্র দে, যিনি সংগীতজগতে অমর হয়ে আছেন মান্না দে নামেই। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দের সান্নিধ্যে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর সাধনা তাঁকে গড়ে তোলে এক অসাধারণ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। রাগসংগীতের গভীরতা, সুরের শুদ্ধতা, কণ্ঠের ব্যাপ্তি এবং আবেগের নিপুণ প্রকাশ—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন উপমহাদেশের সংগীতভুবনের এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।
১৯৪২ সালে হিন্দি চলচ্চিত্রে সংগীতজীবনের সূচনা। এরপর বাংলা, হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়ে তিনি জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিলতা থেকে আধুনিক গানের সহজ আবেগ, রোমান্টিক সুর থেকে দার্শনিক উপলব্ধি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর অসামান্য দক্ষতা। তিনি শুধু সুরের কারিগর ছিলেন না; ছিলেন শব্দের অন্তর্নিহিত অনুভূতিকে কণ্ঠে জীবন্ত করে তোলার এক বিরল শিল্পী।
মান্না দের কণ্ঠে যখন বেজে ওঠে—‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’, তখন শুধু একটি গানের গল্প শোনা যায় না; ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব, যৌবনের উচ্ছ্বাস আর সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনের স্মৃতি। ‘এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি’, ‘যদি কাগজে লেখো নাম’, ‘লাগা চুনরী মে দাগ’ কিংবা ‘পুছো না ক্যায়সে ম্যায়নে র্যায়ন বিটায়ি’—প্রতিটি গানেই তাঁর শিল্পীসত্তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ উন্মোচিত হয়েছে।
আর সেই অমর পঙ্ক্তি—
‘সবাই তো সুখী হতে চায়,
কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না।’
কত সহজ কয়েকটি শব্দ, অথচ তার গভীরে লুকিয়ে আছে সমগ্র মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য। সুখের অন্বেষণ সবার, কিন্তু প্রাপ্তি সবার সমান নয়। কারও জীবনে স্বপ্ন পূরণের আলো, কারও জীবনে অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। মান্না দের কণ্ঠে এই গান যেন মানুষের অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাসেরই সংগীতময় প্রতিধ্বনি।
১৯৫০-এর দশক থেকে কয়েক দশক ধরে তিনি বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের মতো কিংবদন্তিদের সমসাময়িক হয়েও নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র এক আসন। তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি ও শাস্ত্রীয় সংগীতে গভীর দখল তাঁকে করে তুলেছিল অন্যদের থেকে আলাদা। জনপ্রিয়তার প্রচলিত মাপকাঠিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন—প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় তাঁর সাধনা, বৈচিত্র্য ও সৃষ্টির স্থায়িত্বে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া সংগীতজীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। তবে পুরস্কারের তালিকার চেয়েও বড় ছিল মানুষের ভালোবাসা—যে ভালোবাসা প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী সুলোচনা কুমরনের সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন কাটিয়েছেন তিনি। জীবনের শেষ অধ্যায়ে বেঙ্গালুরুতে অবস্থানকালে অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সংগীতসাধনা, স্মৃতি ও অগণিত শ্রোতার আবেগ।
২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে ৯৪ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই মহান শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে একটি যুগের অবসান ঘটেছিল; কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়নি। কারণ, প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না—তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টিতে, মানুষের স্মৃতিতে, ভালোবাসার গভীরে।
আজও কোনো নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় ‘কফি হাউস’ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা দিনে। কোনো বিষণ্ন মুহূর্তে ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’ মনে করিয়ে দেয় জীবনের অপূর্ণতার কথা। আবার প্রেমের কোনো গোপন অনুভূতিতে তাঁর গান হয়ে ওঠে হৃদয়ের একান্ত ভাষা।
মান্না দে চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এমন এক সুরের পৃথিবী, যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায়, স্মৃতি কথা বলে, আর হৃদয় নীরবে গেয়ে ওঠে—এই সুরের মৃত্যু নেই।
প্রয়াণের ত্রয়োদশ বর্ষে এই মহান সংগীতশিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।
মান্না দে—আপনি আছেন, আপনার গানে, আমাদের ভালোবাসায়, অনন্তকাল।


