গাজীপুরের টঙ্গীতে ছয় বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় বামপন্থিদের সম্পৃক্ততার দাবি করেছেন ধর্মীয় বক্তা হাফেজ ক্বারী জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত শিক্ষক ও মারধরে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। তবে বামপন্থিদের সম্পৃক্ততার দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেননি এই বক্তা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি এসব কথা বলেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ লেখেন, ‘টঙ্গীর ঘটনার সাথে জড়িত বামপন্থিরা।’ তবে ঠিক কারা এ ঘটনায় জড়িত কিংবা কীসের ভিত্তিতে তিনি এমন দাবি করছেন, সে বিষয়ে পোস্টে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
টঙ্গীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তখন তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তাঁকে মারধরের ঘটনায় ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষককে মারধর ও বামপন্থিদের সম্পৃক্ততার দাবি
ভিডিওতে জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ বলেন, টঙ্গীতে একজন আলেম ও কোরআনের শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষককে পেটানোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, অথচ ঘটনার পর কিছু মানুষ মারধরকারীদের প্রশংসা করছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিশুটিকে চুমু দেওয়া বা কোলে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষককে মারধর করা কতটা গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা হলে তার প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
তবে এখানে অভিযোগের ধরন ও তার আইনি তাৎপর্য আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো শিশুকে অনুপযুক্তভাবে স্পর্শ করা বা তার প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে কেবল চুমু দেওয়া কিংবা কোলে নেওয়ার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে আগেভাগে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। শিশুটির বক্তব্য, ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগের প্রকৃতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ ভিডিওতে আরও বলেন, শিশুটির অভিভাবক গণমাধ্যমের সামনে মাদ্রাসাশিক্ষকদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ওই মন্তব্য থেকে আলেমদের প্রতি আগে থেকেই বিরূপ মনোভাব থাকার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক অপরাধ করে থাকলে তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত, কিন্তু সে কারণে অন্য আলেমদের দায়ী করা ঠিক নয়।
একই বক্তব্যে তিনি মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধে জড়িত হলে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। অর্থাৎ, অভিযুক্ত শিক্ষক অপরাধ করে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানানোর পাশাপাশি তিনি শিক্ষককে মারধরের ঘটনাটিরও সমালোচনা করেন।
শিশুকে চুমু দেওয়া নিয়ে নতুন পোস্ট
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া আরেকটি পোস্টেও শিশুদের চুমু দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ। সেখানে তিনি লেখেন, ‘নাবালক ছোট বাচ্চাকে চুমু দেওয়া ১০০ বার জায়েজ। তবে খারাপ উদ্দেশ্যে নয়।’
তাঁর এই মন্তব্যের পর টঙ্গীর ঘটনার আলোচনায় শিশুর প্রতি স্নেহ প্রকাশ এবং অনুপযুক্ত স্পর্শের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে কোনো আচরণের গ্রহণযোগ্যতা বিচার করার ক্ষেত্রে শিশুর বয়স, সম্মতি প্রকাশের সক্ষমতা, আচরণের ধরন এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে শিশুর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রশ্নে অভিযোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
কী ঘটেছিল টঙ্গীর মাদ্রাসায়
ঘটনাটি ঘটে গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার করিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায়। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে ছয় বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রিন্সিপাল মুসলেউদ্দিনকে মারধর করেন শিশুটির এক অভিভাবক। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শিশুটির পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকে সে মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। পরিবারের সদস্যরা এর কারণ জানতে চাইলে প্রথম দিকে শিশুটি কিছু বলতে চায়নি। পরিবারের দাবি, ঘটনার কথা প্রকাশ করলে তাকে মারধর করা হবে—এমন হুমকি দেওয়ার কারণে সে ভীত ছিল। পরে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শিশুটি তাদের কাছে ঘটনার বিবরণ দেয়।
এরপর বুধবার দুপুরে শিশুটির অভিভাবক সরাসরি মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানতে চান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কথাবার্তার একপর্যায়ে শিক্ষক শিশুটিকে অশালীনভাবে স্পর্শ করার কথা স্বীকার করছেন বলে প্রতীয়মান হয়। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে অভিভাবক তাঁকে চড় মারেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্য কিংবা তার সঙ্গে যুক্ত বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না। অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আগের ঘটনাতেও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন জুবায়ের
ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায়ও তাঁর ফেসবুক পোস্ট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় তিনি ঘটনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর সমালোচনার মুখে তিনি তাঁর পোস্ট সরিয়ে নেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
টঙ্গীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও একই ধরনের বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঘটনার সঙ্গে বামপন্থিদের সম্পৃক্ততার দাবি করলেও তিনি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ প্রকাশ করেননি।
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে প্রকৃত ঘটনা
টঙ্গীর ঘটনাটি দুটি পৃথক প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, ছয় বছর বয়সী শিশুটির প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা এবং এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত শিক্ষকের দায়। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের পর শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও আইনি দায়।
শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারধর করার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন অনুচিত, তেমনি সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো গোষ্ঠীকে ঘটনার জন্য দায়ী করাও সমীচীন নয়।
এ অবস্থায় তদন্তের ফলাফল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই ঘটনার দায় নির্ধারণ করা উচিত। জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের বামপন্থিদের সম্পৃক্ততার দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুটির নিরাপত্তা, মানসিক সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


