ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোববারের (২৫ অক্টোবর) মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা সামনে থাকলেও ইরানের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর পথ খোলা রেখেছেন তিনি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প বলেন, দুই দেশের মধ্যে একটি চমৎকার ও সুন্দর চুক্তি হতে পারে। তাঁর দাবি, ইরান চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে তেহরান শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে সম্মত হলে সেটি যথাযথভাবে মেনে চলবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের সামরিক কৌশলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী দেশটির বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের অধিকাংশ যুদ্ধবিমান এবং প্রায় ২৫৯টি জাহাজ ধ্বংস বা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরান বর্তমানে রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি হচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর দাবিগুলোকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রস্তাব অস্বীকার তেহরানের
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব ইরান দিয়েছে—এমন খবর প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের বরাতে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাঠানো হয়নি বলে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। এ পথে চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং তেলের দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে প্রণালিটির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বৃদ্ধি পায়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আলোচনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা জোরদার করেছে তেহরান।
কিছু হামলার পরিকল্পনা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তথ্য পাওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন দূতাবাস থেকে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কূটনৈতিক স্থাপনা ও সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
একই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা মধ্যপ্রাচ্যে হামলা আরও জোরদার করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সামরিক চাপ ও কূটনীতির মধ্যে ওয়াশিংটন-তেহরান
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক পদক্ষেপ এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান—দুটি পথই রয়েছে বলে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একদিকে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের সময়সীমা উল্লেখ করছেন, অন্যদিকে চুক্তির সম্ভাবনাও তুলে ধরছেন। তবে দুই দেশের মধ্যে কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা নির্ভর করছে আলোচনার অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর।
ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠানোর খবর অস্বীকার, মার্কিন দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা জোরদার এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের সুরক্ষা এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই সামরিক অভিযান চালাবে কি না, কিংবা শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।


