মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের ইপোহ শহরে পৃথক দুটি অভিযানে বাংলাদেশিসহ ১০৯ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ জন পুরুষ ও ৩৪ জন নারী রয়েছেন। শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত পরিচালিত এসব অভিযানে একটি বিনোদনকেন্দ্র, চারটি ম্যাসাজ পার্লার এবং শহরের একটি পাইকারি বাজারে তল্লাশি চালানো হয়।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের (জেআইএম) উপমহাপরিচালক (অপারেশন) দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি অভিযানের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, পেরাক রাজ্যের অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তা ও সদস্যদের পাশাপাশি পুত্রজায়ায় অবস্থিত বিভাগের বিশেষ অভিযান ও গোয়েন্দা শাখার সদস্য এবং পুলিশের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। দুই অভিযানে মোট ৬৬ জন কর্মকর্তা ও সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।
বিনোদনকেন্দ্র ও ম্যাসাজ পার্লারে অভিযান
লোকমান এফেন্দি রামলির তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৯টার দিকে ‘অপ গেগার’ নামে অভিযান শুরু হয়। ইপোহের একটি বিনোদনকেন্দ্র ও চারটি ম্যাসাজ পার্লারে অবস্থানরত ৭০ জন বিদেশি নাগরিকের পরিচয় ও কাগজপত্র যাচাই করা হয়। এ সময় ৩৪ জন নারীকে আটক করা হয়। তাঁরা থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের নাগরিক বলে জানিয়েছে অভিবাসন বিভাগ।
এরপর রোববার রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ইপোহের পাইকারি বাজারে দ্বিতীয় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে ৭৭ জন বিদেশি নাগরিকের পরিচয় ও নথিপত্র যাচাইয়ের পর ৭৫ জন পুরুষকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, লাওস ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক রয়েছেন।
দুটি অভিযানে মোট ১৪৭ জন বিদেশি নাগরিকের নথিপত্র যাচাই করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১০৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযান চলাকালে কয়েকজন বিদেশি পালানোর চেষ্টা করেন বলে জানান লোকমান এফেন্দি। তবে অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তা ও সদস্যদের তৎপরতায় তাঁদের আটক করা সম্ভব হয়।
অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকা, ভিসা বা অনুমোদিত অবস্থানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করা এবং ইস্যু করা পারমিট বা পাসের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ দেশটির অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩ এবং অভিবাসন বিধিমালা ১৯৬৩-এর আওতাভুক্ত।
অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পেরাক রাজ্যের অভিবাসন বিভাগের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় পাঁচজন নিয়োগকর্তাকে সমন জারি করা হয়েছে। তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য তাঁদের অভিবাসন বিভাগের আইন প্রয়োগ শাখায় হাজির হতে বলা হয়েছে। তবে নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
চলতি বছরে ৬৬ হাজারের বেশি বিদেশি আটক
ইপোহের অভিযান মালয়েশিয়াজুড়ে চলমান অভিবাসন আইন প্রয়োগ কার্যক্রমের অংশ। দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি জানান, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১১ হাজারের বেশি অভিযান পরিচালনা করেছে অভিবাসন বিভাগ। এসব অভিযানে প্রায় দেড় লাখ বিদেশি নাগরিকের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে।
একই সময়ে ৬৬ হাজারের বেশি বিদেশিকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪১ হাজারের বেশি সরাসরি অভিবাসন বিভাগের আইন প্রয়োগকারী অভিযানের মাধ্যমে আটক হন। বাকি ২৪ হাজারের বেশি বিদেশিকে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে আটক বা হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রবেশপথে আটক হওয়া ব্যক্তি এবং অন্যান্য অভিযানের আওতায় আসা বিদেশিরাও এই পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত।
অভিবাসন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর এ সময়ে ৪৫ হাজারের বেশি বিদেশিকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে অভিবাসন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বৈধভাবে অবস্থান ও কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা, পাস এবং ওয়ার্ক পারমিটের শর্ত পূরণ করা জরুরি। অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের ব্যবস্থা করা এবং নির্ধারিত শর্ত মেনে চলা অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে সহায়ক।
বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রেও পাসপোর্ট, ভিসা ও কাজের অনুমতিপত্রের বৈধতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের কর্মীদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অনুমতির বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়।
ইপোহের অভিযানে বাংলাদেশি নাগরিকদের আটকের ঘটনা প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তবে আটক হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণের জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের প্রকাশিত পরিসংখ্যান দেশটিতে বিদেশি নাগরিকদের নথিপত্র যাচাই, আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ধারাবাহিক কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরে। ইপোহের ঘটনায় আটক বাংলাদেশিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এবং তাঁদের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।


