ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী রেহানাকে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিজান হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. এরশাদ আলম (জর্জ)। রায় ঘোষণার সময় আসামি মিজান আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চর মীরেরবাগ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১১ বছর আগে রেহানার সঙ্গে মিজানের বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন মিজান। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় রেহানার পরিবার বিভিন্ন সময়ে জামাতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আসবাবপত্র ও স্বর্ণালংকার দেয়। এমনকি বাড়ি নির্মাণের জন্য টিনের ঘরও তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল।
পরিবারের পক্ষ থেকে এসব সহায়তা দেওয়ার পরও যৌতুকের দাবি বন্ধ হয়নি। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২০ দিন আগে মিজান আবারও রেহানার পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে রেহানার ভাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দুই হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু দাবিকৃত বাকি টাকা না পাওয়ায় মিজান স্ত্রীকে আবারও মারধর করেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই সকাল ৭টার আগে যেকোনো সময় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চর মীরেরবাগ এলাকায় তাঁদের ভাড়া বাসায় রেহানাকে গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মিজান। এ ঘটনার পরদিন, ২৬ জুলাই, রেহানার বড় ভাই মো. আব্বাস দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ মিজানকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় আদালতে উপস্থাপিত সামগ্রিক সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে।
তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আক্কাস মিয়া আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরবর্তী সময়ে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আদালত মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত মিজানকে স্ত্রী হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেন।
যৌতুকের দাবিতে নারীর ওপর নির্যাতন ও হত্যার মতো ঘটনা পরিবার এবং সমাজের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রচলিত আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়াও জরুরি। তবে এ মামলায় দণ্ড ঘোষণার পর আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।


