ইরানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে জোরালো আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হলেও আপাতত হামলা না চালানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে তেহরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো কিংবা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সংকটের অবসান ঘটানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
রোববার মিশিগানে একটি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এ কথা বলেন। সেদিনই ইরানে হামলা চালানো হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি প্রথমে রসিকতার সুরে বলেন, বিষয়টি কি তিনি আগেভাগেই জানিয়ে দেবেন? এরপর সরাসরি উত্তর দিয়ে জানান, ওই দিন ইরানে কোনো হামলা চালানো হচ্ছে না।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তাৎক্ষণিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করলেও তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববার দিনের প্রথম ভাগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সামনে এখন মূলত দুটি পথ রয়েছে—তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অথবা দেশটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া। তাঁর বক্তব্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও স্পষ্ট হয়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন ট্রাম্প। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে ওই প্রণালি ব্যবহার করে আগের মতো বাণিজ্যিক বা কৌশলগত সুবিধা নিতে পারছে না। তবে এ বিষয়ে তাঁর দাবির স্বাধীন যাচাইযোগ্য বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনে এই পথ ব্যবহৃত হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো বিরোধ আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
শনিবার, ২৪ অক্টোবরও ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আবারও হামলা চালাতে পারে, অথবা একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে ইরান ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতায় পৌঁছালে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখার বার্তাও দিচ্ছে। তবে নতুন কোনো হামলা হবে কি না, কিংবা দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানে বড় ধরনের যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে জুনে দুই পক্ষের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।
নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। এমন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্বাচনের বিবেচনাই তাঁর সামরিক অবস্থানের প্রধান কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
তাৎক্ষণিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প আপাতত উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু ইরানকে দেওয়া তাঁর কঠোর হুঁশিয়ারি এবং সামরিক বিকল্প খোলা রাখার বক্তব্য বলছে, সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত। আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগোয়, নাকি নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ে, সেটিই হবে পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণের প্রধান বিষয়।


