আইন পেশা কারও কাছে জীবিকা, কারও কাছে পেশাগত প্রতিষ্ঠা অর্জনের মাধ্যম; কিন্তু কারও কারও কাছে তা হয়ে ওঠে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর আজীবন ব্রত। অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।
আদালতের অঙ্গনে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘গরিবের আইনজীবী’ হিসেবে। তাঁর কাছে আইনের লড়াই কেবল অর্থবান মানুষের অধিকার আদায়ের বিষয় ছিল না; বরং অসহায়, নিঃস্ব ও বঞ্চিত মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথটুকু সুগম করাও ছিল পেশাগত দায়িত্বের অংশ। দীর্ঘ আইনজীবীজীবনে অসংখ্য দরিদ্র বিচারপ্রার্থীকে বিনা পারিশ্রমিকে কিংবা নামমাত্র ফিতে আইনি সহায়তা দিয়েছেন তিনি। এভাবেই পেশাগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদারের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১ জানুয়ারি, তৎকালীন কুমিল্লা জেলার লাকসাম এলাকার শানিচোঁ গ্রামে। তাঁর বাবা আব্দুল আজিজ মজুমদার এবং মা জোলেখা বিবি।
গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা বাসেত মজুমদার শৈশব থেকেই শিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। স্থানীয় হরিশ্চর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক। সেই স্বপ্ন পূরণের পথ ধরেই তাঁর আইনজীবী হওয়া। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি শুধু নিজের পেশাগত সাফল্যেই থেমে থাকেননি; আইনকে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
আইন পেশায় দীর্ঘ পথচলা
১৯৬৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
এরপর দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আইন পেশায় সক্রিয় ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আইন অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক বজায় ছিল। সততা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং আইনের সূক্ষ্ম বিষয় অনুধাবনের দক্ষতা তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের একজন সম্মানিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
পেশাগত জীবনের শুরুটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। সীমিত সামর্থ্য, অনিশ্চয়তা ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁকে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সাধারণ মানুষের সংকট ও অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল। সম্ভবত সে কারণেই জীবনের পরবর্তী সময়ে দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর কাছে কখনো নিছক অন্যের সমস্যা হয়ে থাকেনি।
কেন তিনি ‘গরিবের আইনজীবী’?
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদ-পদবি দিয়ে নয়, মানুষের জন্য তিনি কী করেছেন, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়। আব্দুল বাসেত মজুমদারের জীবন তারই প্রমাণ।
আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে বহু মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন না। মামলা পরিচালনার খরচ, আইনজীবীর ফি এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার চাপ অনেক অসহায় মানুষকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়। বাসেত মজুমদার এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন গভীরভাবে।
তিনি অসংখ্য দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকে কিংবা নামমাত্র ফিতে মামলা পরিচালনা করেছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর দীর্ঘ পেশাজীবনে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিনা মূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে আইনি সহায়তা পেয়েছেন।
এই সংখ্যার তাৎপর্য শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে হাজারো মানুষের অসহায়ত্ব, ন্যায়বিচার পাওয়ার আকুতি এবং একজন আইনজীবীর মানবিক দায়বদ্ধতা।
তাঁর কাছে অর্থের অভাবে কোনো অসহায় মানুষ যেন ন্যায়বিচারের দরজা থেকে ফিরে না যান—এই বিবেচনাই ছিল বড়। আইন পেশাকে তিনি নিছক উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মহৎ সুযোগ হিসেবে।
এই কারণেই আদালতপাড়ায় তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায় একটি পরিচয়—‘গরিবের আইনজীবী’।
আইনজীবীদের অধিকার ও কল্যাণে অবদান
আব্দুল বাসেত মজুমদার শুধু বিচারপ্রার্থীদের জন্য কাজ করেননি, আইনজীবী সমাজের কল্যাণেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আইনজীবীদের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণের প্রশ্নে তাঁর সক্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা আইনজীবীদের সহায়তার জন্য তাঁর উদ্যোগ স্মরণীয়। দুস্থ আইনজীবীদের কল্যাণে তিনি নিজের নামে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মানবিক দায়িত্ব কেবল আদালতের বিচারপ্রার্থীদের প্রতিই নয়; একই পেশার আর্থিকভাবে অসচ্ছল সহকর্মীদের প্রতিও বিস্তৃত।
তাঁর এই ভূমিকা নবীন আইনজীবীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ যে একজন আইনজীবীকে সত্যিকার অর্থে সম্মানিত করে, তাঁর জীবন তারই শিক্ষা দেয়।
ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনে ভূমিকা
একটি সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত আইনের শাসন। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তবায়ন ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আব্দুল বাসেত মজুমদার তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আদালতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি আইনি যুক্তি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করেছেন।
তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, একজন আইনজীবীর দায়িত্ব কেবল মক্কেলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনেই শেষ হয় না। ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা, পেশাগত সততা এবং বিচারপ্রার্থীর প্রতি দায়বদ্ধতাও একজন আইনজীবীর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও আইনজীবী সমাজে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, মানবিক ভূমিকা ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
প্রয়াণ: মানুষটি চলে গেলেন, আদর্শ রয়ে গেল
২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর সকালে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন প্রবীণ এই আইনজীবী। মেরুদণ্ডের সমস্যা ও বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের আইন অঙ্গন হারায় একজন অভিজ্ঞ ও সম্মানিত আইনজীবীকে। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ‘গরিবের আইনজীবী’ পরিচয়টির গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং নতুন করে সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—অর্থের অভাবে কোনো মানুষ কি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন?
আব্দুল বাসেত মজুমদারের জীবন এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের সামনে একটি মানবিক দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। পেশাগত সাফল্যের সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা যুক্ত হলে একজন মানুষ কীভাবে বৃহত্তর সমাজের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তাঁর জীবন তারই প্রমাণ।
উত্তরাধিকার: মানবিক আইনচর্চার অনুপ্রেরণা
আব্দুল বাসেত মজুমদারের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু তাঁর পেশাগত পদ-পদবি কিংবা দীর্ঘ কর্মজীবন নয়। তাঁর প্রকৃত অর্জন সেই মানুষেরা, যাঁরা আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন, অথচ তাঁর সহযোগিতায় ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
তাঁর জীবন নবীন আইনজীবীদের মনে করিয়ে দেয়—আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারাই আরও বড় সার্থকতা। সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সহকর্মীদের সহযোগিতা করা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল থাকা—এসবই তাঁর জীবন থেকে নেওয়ার মতো শিক্ষা।
সব মানুষ সমান সামর্থ্য নিয়ে জন্মান না। কিন্তু ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সবার সমান। এই বিশ্বাসকে নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে ধারণ করেছিলেন আব্দুল বাসেত মজুমদার।
তিনি ছিলেন এমন একজন আইনজীবী, যাঁর কাছে আইনের ভাষার পাশাপাশি মানুষের নীরব কান্নাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর অবদান, অসহায়ের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা এবং আইন পেশার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
গরিবের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।



