সম্প্রতি মুম্বাইয়ে একটি সংগীতানুষ্ঠানে তাঁর পারফরম্যান্স বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন শিল্পা রাও। তবে এই ঘটনা তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা অধ্যায়, বিশেষ করে পরিচিতি পাওয়ার আগে সংগ্রাম ও নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্পকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
‘চালেয়া’ থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
শাহরুখ খান অভিনীত ‘জওয়ান’ সিনেমার রোমান্টিক গান ‘চালেয়া’ শিল্পা রাওয়ের ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি। গানটিতে তাঁর কণ্ঠের আবেগ, সাবলীলতা ও পরিবেশনা শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়ায়। এই গানের জন্য ২০২৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
এর আগেও একাধিক জনপ্রিয় গানে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পা। ‘ঘুঙরু’ ও ‘বেশরম রঙ’-এর মতো গান তাঁর কণ্ঠকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে। অন্যদিকে ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’ সিনেমার গানেও তাঁর কণ্ঠের আবেদন শ্রোতাদের নজর কেড়েছে।
শিল্পার গায়কির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গানের ধরন অনুযায়ী কণ্ঠের প্রকাশভঙ্গি বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। রোমান্টিক গান থেকে শুরু করে আধুনিক বিটনির্ভর সংগীত—বিভিন্ন ধারায় তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন। এ কারণেই বলিউডের সংগীতপরিচালকদের কাছে তিনি পরিচিত ও চাহিদাসম্পন্ন একজন শিল্পী হয়ে উঠেছেন।
গ্র্যামি মনোনীত অ্যালবামে কণ্ঠ
শিল্পা রাওয়ের সংগীতযাত্রা শুধু বলিউডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনেও তাঁর কাজের পরিচিতি রয়েছে। প্রখ্যাত সেতারশিল্পী আনুশকা শঙ্করের ‘লাভ লেটার্স’ অ্যালবামে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। অ্যালবামটি ২০২১ সালের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে মনোনয়ন পেয়েছিল।
গ্র্যামির মতো আন্তর্জাতিক সংগীত পুরস্কারের জন্য মনোনীত অ্যালবামে কাজ করা শিল্পার ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাইরে ভিন্ন সংগীতধারার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার বাইরেও তাঁর সংগীতচর্চার পরিসর বিস্তৃত।
মঞ্চে গান থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
পেশাগত সাফল্যের মধ্যেই সম্প্রতি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে আলোচনায় এসেছেন শিল্পা রাও। মুম্বাইয়ে ‘বলিউড মিউজিক প্রজেক্ট’-এর দশম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার সময় তিনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গান চলাকালে তাঁর মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে মঞ্চের আলোও নিভিয়ে দেওয়া হলে তাঁর পরিবেশনা আকস্মিকভাবে থেমে যায়। এ ঘটনায় উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয় এবং বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটি নিয়ে শিল্পা নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্বামীও এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় একে দুঃখজনক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে ঠিক কী কারণে তাঁর পরিবেশনা বন্ধ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। শিল্পীর সঙ্গে এমন পরিস্থিতি কেন ঘটল, তা নিয়ে সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল দিয়ে শুরু
আজকের পরিচিতি অর্জনের আগে শিল্পা রাওকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের দক্ষতা তৈরি করতে হয়েছে। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে তিনি প্রায় তিন বছর বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল রেকর্ড করেছেন।
ক্যাডবেরি মাঞ্চ, সানসিল্ক ও অ্যাঙ্কর জেলের মতো ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ বহু মানুষের কাছে পৌঁছালেও তখনও অধিকাংশ শ্রোতার কাছে তিনি পরিচিত নাম হয়ে ওঠেননি।
তবে এই সময়টিকে কেবল অপেক্ষার অধ্যায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিজ্ঞাপনের জন্য নিয়মিত রেকর্ডিং করতে গিয়ে স্টুডিওতে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন শিল্পা। অল্প সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সুর, ছন্দ ও আবেগ প্রকাশ করা, রেকর্ডিংয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং কণ্ঠের সূক্ষ্মতা নিয়ন্ত্রণ করার মতো দক্ষতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়।
সংগীতজীবনের শুরুর দিকে শঙ্কর মহাদেবনের নির্দেশনায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোট পরিসরে কাজ শুরু করতে তিনি পিছপা হননি। বরং নিয়মিত অনুশীলন ও রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে নিজের গায়কিকে আরও পরিণত করেছেন।
কণ্ঠ নিয়ে প্রত্যাখ্যান, তবু থামেননি
শিল্পা রাওয়ের সাফল্যের গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য। বলিউডের প্রচলিত গায়কির ধরন থেকে তাঁর কণ্ঠের কিছু বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁকে প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংগীতজগতে নতুন শিল্পীদের জন্য নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করা সহজ নয়। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানের ক্ষেত্রে কণ্ঠের ধরন, সুরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং সংগীতপরিচালকের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিল্পার ক্ষেত্রেও শুরুতে এই চ্যালেঞ্জগুলো ছিল।
তবে নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে সেটিকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে তাঁর গায়কির নিজস্ব ধরন শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। জনপ্রিয় গান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংগীত প্রকল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি সেই অবস্থান আরও দৃঢ় করেছেন।
অপেক্ষা থেকে শিল্পা হওয়ার গল্প
শিল্পা রাওয়ের জন্ম ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জামশেদপুরে। তাঁর জন্মনাম অপেক্ষা রাও। সংগীতজগতে পরিচিত হওয়ার আগে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে শিল্পা রাও রাখেন।
নাম পরিবর্তনের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘শিল্পা’ নামটি তাঁর কাছে শিল্পকর্ম ও সৃজনশীলতার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘শিল্প’ শব্দের সঙ্গে শিল্পীর কাজের যে যোগসূত্র রয়েছে, তা তাঁকে নিজের সংগীতচর্চার আরও কাছাকাছি অনুভব করিয়েছে।
নাম পরিবর্তনকে তাঁর জীবনের সাফল্যের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সচেতনতা এবং সংগীতের প্রতি নিবেদন তাঁর যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিচিতির শুরুতে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, ক্যারিয়ারের শুরুর প্রত্যাখ্যান এবং পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান—সব মিলিয়ে তাঁর পথচলা ধারাবাহিক পরিশ্রমের উদাহরণ।
শিল্পা রাওয়ের জীবন থেকে স্পষ্ট হয়, সংগীতজগতে প্রতিষ্ঠা পেতে শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখার সাহস। যে কণ্ঠ একসময় প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছিল, সেই কণ্ঠই আজ লাখো শ্রোতার কাছে পরিচিত। সাম্প্রতিক মঞ্চের ঘটনা তাঁকে নতুন করে আলোচনায় আনলেও তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার মূল পরিচয় রয়ে গেছে সাফল্য, অধ্যবসায় ও নিজস্ব কণ্ঠস্বরের ওপর আস্থায়।



