স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ-হত্যার আসামি পুলিশের গুলিতে নিহত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গাইঘাটায় এক নাবালিকা স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার প্রধান অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাস পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোররাতে অপরাধস্থলে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে থানায় ফেরার পথে পুলিশের কাছ থেকে রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা এবং গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ সময় পুলিশের পাল্টা গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় প্রহ্লাদ দাস পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। তাঁকে নিয়ে অপরাধস্থলে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি এক পুলিশ কর্মকর্তার রিভলভার ছিনিয়ে নেন এবং পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে অন্তত তিন রাউন্ড গুলি চালান। এতে এক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আত্মরক্ষার্থে আরেক পুলিশ কর্মকর্তা চার রাউন্ড গুলি চালান। এতে প্রহ্লাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান।

পরে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। তবে পুরো ঘটনার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বাড়ির পেছনে উদ্ধার হয় স্কুলছাত্রীর মরদেহ

গত রোববার সকালে গাইঘাটা থানা এলাকার একটি বাড়ির পেছন থেকে ওই স্কুলছাত্রীর অর্ধনগ্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগের রাতে একটি স্থানীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল মেয়েটি।

নিহত কিশোরীর মায়ের অভিযোগ, অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর মেয়েকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে পরদিন সকালে বাড়ির পেছনে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

নিহত ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে গাইঘাটা থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অপরাধের কথা স্বীকার করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে তাঁর কথিত স্বীকারোক্তির বিস্তারিত এবং মামলার অন্যান্য প্রমাণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগে তদন্তের ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্তের মৃত্যু হলেও এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গাইঘাটার স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। নিহত কিশোরীর পরিবারও ন্যায়বিচারের আশায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে অভিযুক্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মামলার সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে, এমনটি বলা যায় না। কীভাবে স্কুলছাত্রীটির মৃত্যু হয়েছিল, ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না এবং পুলিশের হেফাজতে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

ঘটনার পর বৈদ্যবাড়ির সংশ্লিষ্ট সড়কটি পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছে বলে জানা গেছে। ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

তিন মাসের ব্যবধানে একই ধরনের ঘটনা

পশ্চিমবঙ্গে এর আগে গত জুলাই মাসেও বারুইপুরে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তি পুলিশের কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই ঘটনার প্রায় তিন মাস পর গাইঘাটায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটল।

বারুইপুরের ঘটনার সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। নারী সুরক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপের বার্তা দেন। উত্তর প্রদেশ ও আসামের মতো রাজ্যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পশ্চিমবঙ্গেও তা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

গাইঘাটার ঘটনাটি আবারও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, যৌন সহিংসতার বিচার এবং পুলিশের হেফাজতে অভিযুক্তদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া ও গুলি চালানোর অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

নিহত স্কুলছাত্রীর পরিবার যাতে ন্যায়বিচার পায়, সে জন্য মামলার প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহ ও যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্তের মৃত্যুতে ফৌজদারি মামলার তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া আর এগোবে না; তবে ঘটনার অন্যান্য দিক এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা থাকলে তা তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

দ্রষ্টব্য: ঘটনাটির বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর বিবরণ পাওয়া গেছে। স্বাধীন তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের গুলির পরিস্থিতি ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের সব দিক চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।