মাত্র ১৮ বছরের এক অকুতোভয় তরুণ! হাতে গ্রেনেড, বুকে অদম্য সাহস আর হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন। শত্রুর মেশিনগানের গর্জন থামাতে নিজের জীবন বাজি রেখে যিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মৃত্যুর মুখে, তাঁর নাম বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা রয়েছে আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের অক্ষয় অক্ষরে।
মোহাম্মদ হামিদুর রহমান বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’
উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ।
জন্ম ও শৈশব
১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হামিদুর রহমান। তাঁর পিতা আক্কাস আলী মণ্ডল এবং মাতা মোসাম্মৎ কায়মুন্নেসা। সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণের শৈশব কেটেছিল সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে। খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি স্থানীয় একটি নাইট স্কুলে লেখাপড়া করেন।
১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সিপাহি পদে যোগ দেন। প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যা ও সামরিক অভিযানের পর দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আর নীরব থাকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার শপথ নেন।
ধলই সীমান্তে বীরত্বের অমর উপাখ্যান
মুক্তিযুদ্ধের সময় হামিদুর রহমান ৪ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে সিলেটের শ্রীমঙ্গল সীমান্তসংলগ্ন ধলই বিওপি দখলের অভিযানে তিনি অংশ নেন। ধলই সীমান্ত ফাঁড়িতে পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে শত্রুপক্ষের মেশিনগানের অবিরাম গুলিবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২৮ অক্টোবরের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি নিষ্ক্রিয় করার দায়িত্ব পড়ে তরুণ সিপাহি হামিদুর রহমানের ওপর। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি। পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুক ঘষে ঘষে, শত্রুর চোখ এড়িয়ে তিনি এগিয়ে যান মেশিনগান পোস্টের দিকে। সঙ্গে ছিল গ্রেনেড আর হৃদয়জুড়ে ছিল স্বাধীনতার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা।
তিনি একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শত্রুর অবস্থানে আঘাত হানেন। কিন্তু শত্রুর গুলিতে নিজেও গুরুতরভাবে আহত হন। তবু থামেননি তিনি। আহত অবস্থাতেই মেশিনগান পোস্টের দিকে এগিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সম্মুখসংঘর্ষে লিপ্ত হন। শেষ পর্যন্ত তাঁর অসীম সাহসিকতায় শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে যায় এবং তাঁরা ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করতে সক্ষম হন।
কিন্তু সেই বিজয়ের মুহূর্তটি নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি হামিদুর রহমান। দেশকে শত্রুমুক্ত করার লড়াইয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি উৎসর্গ করেন নিজের অমূল্য জীবন। যুদ্ধ শেষে সহযোদ্ধারা উদ্ধার করেন তাঁর নিথর দেহ।
এক বীরের শেষ ঠিকানা থেকে স্বদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন
শহীদ হামিদুর রহমানকে প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের একটি পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। দীর্ঘদিন তাঁর সমাধি ছিল সীমান্তের ওপারে, প্রতিবেশী দেশের মাটিতে। অবশেষে ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
এ যেন এক বীর সন্তানের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান—যে তরুণ নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এলেন মৃত্যুর ৩৬ বছর পর।
স্মৃতিতে অমর বীরশ্রেষ্ঠ
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ হামিদুর রহমানকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়। তাঁর জন্মস্থান খর্দ্দ খালিশপুরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে হামিদনগর। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। এ ছাড়া তাঁর নামে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়া স্থাপনা।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ কোনো ভবন, জাদুঘর কিংবা নামফলক নয়—
তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, লাল-সবুজের পতাকা এবং একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের ওপর আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার।
হামিদুর রহমানের জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেমের জন্য বয়স বড় নয়, বড় হলো সাহস, আত্মবিশ্বাস ও আত্মত্যাগের মানসিকতা। স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও বীরত্বের মৃত্যু নেই।
আজও যখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে পতপত করে উড়তে দেখি লাল-সবুজের পতাকা, তখন সেই পতাকার প্রতিটি ভাঁজে মিশে থাকে হামিদুর রহমানের মতো অসংখ্য বীর সন্তানের রক্ত, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের ইতিহাস।
হে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, তোমার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
তুমি ছিলে স্বাধীনতার দুর্জয় সৈনিক, তুমি আছো বাংলাদেশের হৃদয়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তোমার বীরত্বের কাহিনি উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধায়। তোমার আত্মত্যাগ আমাদের চিরকাল স্মরণ করিয়ে দেবে—স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়, স্বাধীনতা অর্জিত হয় রক্ত, সাহস আর অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, হে বীরশ্রেষ্ঠ।
তুমি অমর, তোমার বীরত্ব অম্লান, তোমার আত্মত্যাগ চিরভাস্বর।


