মাত্র ৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের শুরুতেই চরম বিপর্যয়ে পড়েছিল আফগানিস্তান। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২২১ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে দলটি। এই অসম্ভব প্রত্যাবর্তনের নায়ক আজমতউল্লাহ ওমরজাই। ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৫০ বলে ১১৬ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেছেন তিনি। একই সঙ্গে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছয় বা তার নিচের পজিশনে ব্যাট করতে নেমে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন এই আফগান অলরাউন্ডার। তাঁর দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে জিম্বাবুয়েকে ১৯ রানে হারিয়েছে আফগানিস্তান।
ম্যাচের শুরুতে আফগানিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেন জিম্বাবুয়ের বোলাররা। মাত্র পাঁচ রানের মধ্যে চারটি উইকেট হারিয়ে বড় চাপে পড়ে যায় দলটি। একের পর এক ব্যাটার সাজঘরে ফেরায় আফগানিস্তানের ইনিংস দ্রুত গুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। টপ অর্ডারের মধ্যে কেবল সেদিকউল্লাহ আতাল দুই অঙ্কের রান করতে পেরেছিলেন। তবে ২১ বলে ১৭ রান করে নবম ওভারে তিনিও আউট হন।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ক্রিজে এসে পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নেন ওমরজাই। শুরু থেকেই জিম্বাবুয়ের বোলারদের ওপর চড়াও হন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ের আগ্রাসনে ম্যাচের গতিপথ বদলে যেতে শুরু করে। এই সময় তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ইজাজ আহমেদ আহমাদজাই। দুজন মিলে দারুণ এক জুটি গড়ে আফগানিস্তানকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলেন।
ষষ্ঠ উইকেটে মাত্র ৫৯ বলে ১৪২ রান যোগ করেন ওমরজাই ও ইজাজ। এই জুটিই মূলত আফগানিস্তানের ইনিংসের ভিত গড়ে দেয়। ইজাজও ব্যাট হাতে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান। মাত্র ২৭ বলে পাঁচটি চার ও তিনটি ছক্কার সাহায্যে ৫২ রান করেন তিনি। দলীয় সংগ্রহ ১৮০ রানে পৌঁছালে তাঁর বিদায়ে ভাঙে গুরুত্বপূর্ণ এই জুটি।
তবে ইজাজের বিদায়ের পরও থামেননি ওমরজাই। নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৯তম ওভারে আউট হওয়ার আগে ৫০ বলে ১১৬ রান করেন এই অলরাউন্ডার। তাঁর ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার ও ১২টি ছক্কা। ২৩২ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে তিনি একাই আফগানিস্তানকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন।
এই ইনিংসের মাধ্যমে নতুন একটি রেকর্ডও গড়েছেন ওমরজাই। পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছয় নম্বর কিংবা তার নিচের পজিশনে ব্যাট করতে নেমে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। এর আগে এই রেকর্ড ছিল আফগানিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ নবীর দখলে। ২০১৭ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ছয় নম্বরে নেমে ৮৯ রান করেছিলেন তিনি।
রেকর্ড গড়ার পথে ওমরজাই পেছনে ফেলেছেন স্যাম বিলিংস, ক্যামেরন হোয়াইট ও ডেভিড মিলারকেও। ২০১৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিলিংস করেছিলেন ৮৭ রান। ২০১০ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ৮৫ রান ছিল হোয়াইটের। অন্যদিকে ২০২১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৮৫ রান করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভিড মিলার।
ওমরজাই আউট হওয়ার পর ইনিংসের শেষ দিকে ঝড় তোলেন আফগান অধিনায়ক রশিদ খান। মাত্র ছয় বলে চারটি ছক্কা হাঁকিয়ে অপরাজিত ২৫ রান করেন তিনি। অন্য প্রান্তে দুই রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন মুজিব উর রহমান। তাঁদের অবদানে নির্ধারিত ওভারে ২২১ রানের বড় সংগ্রহ পায় আফগানিস্তান। পুরো ইনিংসে দলটির রান তোলার হার ছিল ওভারপ্রতি ১১.০৫।
২২২ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে জিম্বাবুয়েও লড়াই চালিয়ে যায়। অধিনায়ক সিকান্দার রাজা সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় শতক। শেষ পর্যন্ত জয়ের আশা বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা চালালেও সতীর্থদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি রাজা।
নিজের অভিষেক ম্যাচে তাফাদজোয়া সিগাও ব্যাট হাতে মূল্যবান অবদান রাখেন। তবে রায়ান বার্লের বিদায়ে জিম্বাবুয়ের জয়ের সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা লাগে। বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় রান তোলার চাপ সামলাতে পারেনি দলটি। শেষ পর্যন্ত ১৯ রানের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আফগানিস্তান।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজেদের আধিপত্য আরও সুসংহত করেছে আফগানরা। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টানা অষ্টম টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছে দলটি। অন্যদিকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে এখনো কোনো টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিততে পারেনি জিম্বাবুয়ে।
মাত্র পাঁচ রানে চার উইকেট হারানোর পরও ২২১ রান সংগ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নেওয়া আফগানিস্তানের জন্য নিঃসন্দেহে স্মরণীয় অর্জন। ওমরজাইয়ের রেকর্ডগড়া সেঞ্চুরি ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলেও ইজাজের সঙ্গে তাঁর অসাধারণ জুটি এবং শেষ দিকে রশিদ খানের ঝোড়ো ব্যাটিংও জয়ের পথ তৈরি করেছে। ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি দলকে জেতানোর এই পারফরম্যান্স আফগান ক্রিকেটের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।


