ইরানে সপ্তাহজুড়ে হামলার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সম্ভাব্য সাত দিনব্যাপী এ অভিযান শুরু হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। অন্যদিকে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আগেই কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সাত দিনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন। এ অভিযানের লক্ষ্যবস্তু এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে। তবে সামরিক প্রস্তুতি চললেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া অভিযান শুরু হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি ও সামরিক সমন্বয় নিয়ে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে কথা বলেছেন ইসরাইলের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াল জামির। দুই দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের এই যোগাযোগকে ইরানকে ঘিরে চলমান পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন। গত ২০ অক্টোবর দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, অভিযান সম্পন্ন করার অর্থ হবে ইরানের নেতৃত্বের পতন ঘটানো। দেশটির সরকার পরিবর্তনকে ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলেও জানান নেতানিয়াহু। তবে ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিয়েছে, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও। বিশেষ করে ইরান পাল্টা হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশকে নতুন সামরিক অভিযান এবং এর জবাবে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কাতার ইরান ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে আলোচনার জন্য আরও সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযানের বিষয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। এতে বোঝা যাচ্ছে, সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। এর আওতায় ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী এবং মেরিন সেনা বহনকারী উভচর অবতরণকারী যুদ্ধজাহাজ আরব উপসাগরের দিকে পাঠানো হয়েছে। বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালিত যুদ্ধবিমান আকাশপথে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, উভচর যুদ্ধজাহাজ সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ায়।

এপির তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই সামরিক মোতায়েনে প্রায় ৯ হাজার সদস্য রয়েছেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও মেরিন সেনার মোট উপস্থিতি ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁদের সহায়তায় থাকবে কয়েকশ সামরিক উড়োজাহাজ। এই বিপুল সামরিক উপস্থিতি সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অন্যদিকে, পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের অধীনে কৌশল, পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণবিষয়ক দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ব্রেট সিলভিয়াকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেট সিলভিয়াকে দায়িত্ব থেকে সরানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলার মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর অপসারণের সঙ্গে ইরানবিষয়ক সামরিক পরিকল্পনার সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।