বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সময়ের ব্যবধানেও আলোচনা থামে না। দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা তাঁদেরই একজন। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের ৬৬তম জন্মদিন আজ। ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস প্রদেশের লানুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই শিশুই একসময় নিজের অসাধারণ প্রতিভা, শৈল্পিক ফুটবলশৈলী ও নেতৃত্বগুণ দিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ম্যারাডোনা কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন আবেগের নাম। কেউ তাঁকে ফুটবলের ঈশ্বর বলে অভিহিত করেছেন, আবার কেউ দেখেছেন বিদ্রোহী এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। মাঠে তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, অসাধারণ ড্রিবলিং, ক্ষিপ্র গতি এবং নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক খেলোয়াড়দের থেকে আলাদা করেছিল। বিশেষ করে বাঁ পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। তাঁর নেতৃত্ব ও অসাধারণ নৈপুণ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। পুরো আসরে দলের আক্রমণভাগের মূল ভরসা ছিলেন তিনি। পাঁচটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জেতেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ওই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা তাঁর দুটি গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে। ম্যাচের প্রথম গোলটি হাত দিয়ে করেছিলেন ম্যারাডোনা। পরে এই গোলের নাম দেন ‘হ্যান্ড অব গড’। এর কয়েক মিনিট পরই নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে অসাধারণ একটি গোল করেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসে যা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একই ম্যাচে বিতর্কিত একটি গোল এবং অবিশ্বাস্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের এমন সমন্বয় খুব কমই দেখা গেছে।
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে যান ম্যারাডোনা। তবে শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় দলটি। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাদক পরীক্ষায় নিষিদ্ধ পদার্থ শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে টুর্নামেন্ট থেকে প্রত্যাহার করা হয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের শেষ দিকে এ ঘটনা বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।
ক্লাব ফুটবলেও ম্যারাডোনার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। পেশাদার ক্যারিয়ারে ছয়টি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পা দেওয়ার কিছুদিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর খেলেছেন বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া ও নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে। আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের স্মৃতি ধরে রাখতে ক্লাবটির স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম।
তবে তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় কেটেছে ইতালির নাপোলিতে। ১৯৮৪ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে নাপোলিতে যোগ দেন ম্যারাডোনা। তাঁর নেতৃত্বে দলটি ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে প্রথমবারের মতো ইতালিয়ান সিরি ‘আ’ শিরোপা জেতে। এরপর ১৯৮৯-৯০ মৌসুমেও লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় নাপোলি। ১৯৮৯ সালে ক্লাবটির উয়েফা কাপ জয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই ইউরোপীয় ফুটবলে নাপোলি নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। শহরটির মানুষের কাছে ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন ফুটবলের বাইরেও এক আবেগের প্রতীক।
বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তাঁর মোট গোলসংখ্যা ৩৪৬ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রায় দুই দশকের পেশাদার ক্যারিয়ারে অর্জিত সাফল্য তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে দিয়েছে। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক অবস্থান ও বিভিন্ন বিতর্কের কারণেও আলোচনায় ছিলেন তিনি। তাঁর জীবন ছিল সাফল্য, সংগ্রাম, আবেগ ও বিতর্কের এক জটিল সমন্বয়।
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে মারা যান এই কিংবদন্তি। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ কমেনি। ২০২১ সালে নাপোলি নিজেদের স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখে স্তাদিও দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। অন্যদিকে, ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। একইভাবে ২০২২-২৩ মৌসুমে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর সিরি ‘আ’ শিরোপা পুনরুদ্ধার করে নাপোলি। কিন্তু জীবদ্দশায় নিজের প্রিয় দেশ ও ক্লাবের এই সাফল্যগুলো দেখে যেতে পারেননি ম্যারাডোনা।
আজ তাঁর জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা স্মরণ করছেন সেই মানুষটিকে, যিনি একাই বদলে দিতে পারতেন একটি ম্যাচের চিত্র। তাঁর অসাধারণ বাঁ পায়ের জাদু, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং নাপোলির হয়ে গড়ে তোলা সাফল্যের ইতিহাস ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে। সময়ের সঙ্গে ফুটবল বদলাবে, নতুন তারকারা আসবেন; কিন্তু দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো একজন কিংবদন্তির জায়গা ইতিহাসে চিরকালই আলাদা থাকবে।



