সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। দীর্ঘ অপেক্ষা ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে তাঁদের মরদেহ দেশে আনা হয়। প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখতে বিমানবন্দরে উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
শনিবার সকাল ৮টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সাত শ্রমিকের মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন।
মরদেহ গ্রহণের সময় স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে এই প্রত্যাবর্তন যেমন স্বস্তির, তেমনি অপূরণীয় ক্ষতির বেদনাও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ নিয়ে নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা। নিহতদের বাড়ি নওগাঁ ও নাটোর জেলায়।
এ সময় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দাবি জানান। তাঁদের মতে, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অনেক পরিবারই এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার বিদেশে কর্মরত স্বজনের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাদের সামনে জীবিকা নির্বাহের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের প্রাথমিকভাবে দাফন-কাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া তিন মাস পর প্রত্যেক পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সহায়তা শোকাহত পরিবারগুলোর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে কিছুটা আর্থিক সুরাহা দিতে পারে।
আগুনে প্রাণ হারান ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক
এর আগে গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মোট ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে প্রথম দফায় নয়জনের মরদেহ গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশে আনা হয়েছিল।
তবে বাকি সাতজনের মরদেহ আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মরদেহের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় স্বাভাবিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই অবশিষ্ট সাতজনের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।
পরিচয় শনাক্ত হওয়া সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজন নওগাঁ জেলার এবং দুজন নাটোর জেলার বাসিন্দা। তাঁদের পরিচয় হলো—
-
মো. শাহিন: নওগাঁ সদর উপজেলা।
-
মো. হাসিবুল হাসান শুভ: আত্রাই উপজেলা, নওগাঁ।
-
মিনহাজ প্রামাণিক: আত্রাই উপজেলা, নওগাঁ।
-
মো. মাসিদুল সরদার সজিব: আত্রাই উপজেলা, নওগাঁ।
-
মো. সাগর আলী: আত্রাই উপজেলা, নওগাঁ।
-
মোহাম্মদ শামীম: নলডাঙ্গা উপজেলা, নাটোর।
-
মো. সাব্বির হোসেন: নলডাঙ্গা উপজেলা, নাটোর।
প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে এই দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
বিশেষ করে কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং নিয়মিত নিরাপত্তা তদারকির ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে একটি দুর্ঘটনাই বহু পরিবারের জীবনে স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সৌদি আরবের এই অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্য নয়, দেশের প্রবাসী শ্রমিক সমাজের জন্যও এক গভীর শোকের ঘটনা। প্রথম দফায় নয়জনের মরদেহ ফেরার পর অবশিষ্ট সাতজনের পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ দেশে আনতে অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁদের স্বজনদের।
অবশেষে সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরলেও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো আর্থিক সহায়তায় পূরণ হওয়ার নয়। এখন স্বজনদের প্রত্যাশা, সরকারি প্রতিশ্রুত সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে এবং ভবিষ্যতে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


