উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় এবার বড় ধরনের ফল বিপর্যয় ঘটেছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি)—এই দুই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এ দুই বিষয়ে মোট অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অন্যদিকে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। সে হিসাবে এবার সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
গত ২২ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাসের হার। এর আগে ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ শতাংশ। দীর্ঘ সময় পর আবারও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলে এত বড় ধস দেখা গেল।
ইংরেজি ও আইসিটিতে বেশি অকৃতকার্য
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে ইংরেজি ও আইসিটিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে। এবার ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। অন্যদিকে আইসিটিতে ফেল করেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন।
দুটি বিষয়ে মিলিয়ে মোট অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের ফলাফলে এই দুই বিষয়ের প্রভাব রয়েছে।
ইংরেজি উচ্চশিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একইভাবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। ফলে এ দুটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
পাস করেনি ২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ
শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফলেই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিসংখ্যানেও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। এবার দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি।
গত বছর শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ফলাফলও উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এ ফলাফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কার্যক্রমের তদারকি নিয়ে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেননি, সেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনা করে দুর্বলতার কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ
এবারের ফলাফলে গত বছরের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
ফলাফলের এই অবনতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তাঁদের অনেকের উচ্চশিক্ষায় ভর্তি এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষার সুযোগ
এবারের ফলাফলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি জানিয়েছেন, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। কোনো শিক্ষার্থী যতগুলো বিষয়ে ফেল করেছেন, তাঁকে শুধু সেই বিষয়গুলোতেই আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর এ ঘোষণায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন করে উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পুনঃপরীক্ষার নির্দিষ্ট তারিখ, আবেদনপ্রক্রিয়া ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
এবারের ফলাফল উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার মান, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।
প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শুধু পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান ও প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ফল বিপর্যয় এড়াতে পাঠদান ও মূল্যায়নব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


