দ্বিধা, অপ্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার ঘাটতি—ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশের হারের পেছনে এসব বিষয়ই বড় হয়ে উঠেছে। মাঠে ক্রিকেটারদের ব্যর্থতা যেমন স্পষ্ট ছিল, তেমনি ম্যাচের আগে ও চলাকালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং টিম ম্যানেজমেন্টের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এই পরাজয়ের দায় কেবল অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন দাস কিংবা অন্য ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
গত এক বছরে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের উন্নতির জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। স্পোর্টিং উইকেটে খেলে ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহ নিশ্চিত করা এবং পরে পেসারদের কার্যকর বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কৌশলই ছিল সেই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। এই পদ্ধতিতে স্পিনারদের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে পেস বোলিং ক্রমেই শক্তির জায়গা হয়ে উঠছিল।
ব্যাটিংয়েও প্রতিপক্ষের পেসারদের তুলনায় স্পিনারদের সামলাতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বেশি সমস্যায় পড়তে দেখা যায়। মিরপুরে গত পাঁচ বছরে স্পিনারদের বলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা আউট হয়েছেন ৮০ বার। পেসারদের বলে উইকেট হারানোর সংখ্যা ৭৩। ব্যবধান খুব বেশি না হলেও স্পিনের বিপক্ষে অস্বস্তির বিষয়টি পরিসংখ্যানে স্পষ্ট।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে সেই দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। দুই ইনিংসে বাংলাদেশের হারানো ২০ উইকেটের মধ্যে ১৬টিই নিয়েছেন ক্যারিবীয় স্পিনাররা। অর্থাৎ ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল স্পিন। অথচ নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়েই এমন উইকেট তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন অধিনায়ক নাজমুল।
ব্যাটসম্যানরা স্পিন ভালো খেলেন, নাকি পেস—ম্যাচ শেষে এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুলের উত্তর ছিল, ‘কখনো স্পিন ভালো খেলে, কখনো আবার পেস।’ তাঁর এই বক্তব্য থেকেই স্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের অনিশ্চয়তা কিছুটা স্পষ্ট হয়।
এখানেই বড় প্রশ্ন উঠেছে উইকেটের ধরন নিয়ে। নিজেদের ব্যাটসম্যানদের স্পিন-দুর্বলতা জানা থাকার পরও মিরপুরে স্পিনসহায়ক উইকেট তৈরির প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল? প্রতিপক্ষের শক্তি ও নিজেদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে উইকেট তৈরির কথা বলা হলেও সেই পরিকল্পনা কতটা আগেভাগে এবং যথাযথভাবে করা হয়েছিল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
টেস্ট শুরুর আগে উইকেটের ধরন নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের দীর্ঘ সময়ের দ্বিধা সেই সংশয় আরও বাড়িয়েছে। শুরুতে স্পোর্টিং উইকেট তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা স্পিনসহায়ক হয়ে ওঠে। এমন পরিবর্তন দেখে মনে হয়েছে, উইকেট নিয়ে সিদ্ধান্তটি যথেষ্ট আগে থেকে চূড়ান্ত করা হয়নি। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিপক্ষ, নিজেদের খেলোয়াড়দের সামর্থ্য এবং প্রস্তুতির সময় বিবেচনায় নিয়ে উইকেট পরিকল্পনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাই নয়, বাংলাদেশের স্পিনারদের পারফরম্যান্সও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। চতুর্থ দিনেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের স্পিনারদের বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে সামলেছেন। ম্যাচ শেষে নাজমুলের ব্যাখ্যা ছিল, বোলাররা সঠিক লেংথ বুঝতে পারেননি। তাঁর মতে, জায়গামতো বল করতে পারলে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের আরও বেশি চাপে রাখা সম্ভব হতো।
এখানে স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—যে উইকেটে নিজেদের ব্যাটসম্যানদেরই স্পিন সামলাতে সমস্যা হয়েছে, সেই উইকেটে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার মতো প্রস্তুতি কি বাংলাদেশের স্পিনারদের ছিল? স্পিননির্ভর কন্ডিশন বেছে নেওয়ার পরও বোলাররা যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যকর হতে না পারেন, তাহলে উইকেট নির্বাচনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
প্রস্তুতির ঘাটতিও বাংলাদেশের হারের অন্যতম কারণ। মিরপুর টেস্টের একাদশে থাকা ছয়জন ক্রিকেটার তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে ব্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফেরার পর পুরো দল একসঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছে মাত্র দুই দিন। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ একটি টেস্ট সিরিজের আগে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি এবং কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি দল।
এর মধ্যেও কয়েকজন ক্রিকেটারের ব্যস্ততা ছিল ভিন্ন ধরনের। ঘরোয়া ক্রিকেটের একটি টুর্নামেন্টের নিলামে অংশ নিয়ে তাড়াহুড়া করে অনুশীলনে যোগ দেন তাঁরা। টেস্টের মতো দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে মানসিক প্রস্তুতি, মনোযোগ এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ম্যাচে কয়েকজন ব্যাটসম্যানের শট নির্বাচনে যে অপরিপক্বতা দেখা গেছে, তা তাঁদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচিতে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম ও প্রস্তুতির সময় বের করা কঠিন—এ কথা সত্য। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে কোন ক্রিকেটারদের কোথায় খেলানো হবে, সেটি নির্ধারণ করা দল পরিচালনার অন্যতম দায়িত্ব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই টেস্ট সিরিজ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছিল। কারণ, দুই টেস্টেই জয় পেলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল করার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে।
এমন গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের মাত্র দুই দিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তীব্র গরমে ম্যাচ খেলে দেশে ফিরতে হয়েছে টেস্ট দলের একাধিক ক্রিকেটারকে। দেশে ফেরার পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম কিংবা প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই তাঁদের টেস্ট খেলতে নামতে হয়েছে। ক্রিকেটারদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে এই সূচি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজটি আইসিসির ভবিষ্যৎ সফরসূচির অংশ ছিল না। ফলে বিসিবির সামনে সূচি নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করার সুযোগ ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে টেস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারদের ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিশ্রাম দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু বোর্ড সেই পথে হাঁটেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বোর্ডের আরও কিছু সিদ্ধান্ত, যা টেস্টের আগে দলের মনোযোগ ও প্রস্তুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। টেস্ট শুরুর মাত্র দুই দিন আগে ডোমেস্টিক থ্রি ট্রফির নিলামের আয়োজন করা হয়। সেখানে ক্রিকেটারদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। গুরুত্বপূর্ণ টেস্টের আগে খেলোয়াড়দের এমন ব্যস্ততা কতটা প্রয়োজনীয় ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কোচিং স্টাফের পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। টেস্ট শুরুর মাত্র তিন দিন আগে সকালে ক্রিকেটারদের অনুশীলন করিয়েছিলেন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। কিন্তু সেদিন বিকেলেই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পান মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন। জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে যিনি তখন হাই পারফরম্যান্স দলের কার্যক্রমে মনোযোগী হয়েছিলেন।
নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া সালাহউদ্দীনও এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজের অবস্থান নিয়ে কিছুটা অস্বস্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন। জাতীয় দলের সঙ্গে নিজের বর্তমান সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি যদি বোর্ডের বাইরে থাকতাম তাহলে আমি অনেক কিছু বলতে পারতাম আপনাকে।’
তাঁর এই মন্তব্য কোচিং স্টাফের দায়িত্ব বণ্টন এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি টেস্ট সিরিজের ঠিক আগে ব্যাটিং কোচ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল, সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কী ধরনের পরিকল্পনা কাজ করেছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ, কোচিং স্টাফের স্থিতিশীলতা এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি করাও মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির যে সম্ভাবনা গত এক বছরে তৈরি হয়েছিল, মিরপুরের এই পরাজয় তা নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। স্পোর্টিং উইকেটে খেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা, পেস বোলারদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স—এই তিনটি জায়গায় উন্নতির যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, সেটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্য পেতে শুধু ভালো কয়েকজন ক্রিকেটার থাকলেই হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উপযুক্ত প্রস্তুতি, সঠিক উইকেট নির্বাচন এবং বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্টের সমন্বিত সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, অনুশীলন ও মানসিক প্রস্তুতিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হয়।
মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হয়েছেন, বোলাররাও প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। অধিনায়ক হিসেবে নাজমুলের নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে এসব ব্যর্থতার পাশাপাশি বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ, মাঠে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের পেছনে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার বড় ভূমিকা থাকে।
বাংলাদেশের সামনে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজটি সেই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারত। কিন্তু অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি, উইকেট নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা এবং ব্যবস্থাপনাগত অসংগতি মিলিয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তাই এই হারের দায় শুধু নাজমুল, লিটন কিংবা অন্য ক্রিকেটারদের নয়; বিসিবি ও টিম ম্যানেজমেন্টকেও নিজেদের সিদ্ধান্তের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।



