পাকিস্তান ক্রিকেটে নতুন করে আশার আলো ছড়াচ্ছেন ২১ বছর বয়সী অলরাউন্ডার আরাফাত মিনহাস। ব্যাট হাতে ঝড়ো ইনিংস, বল হাতে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দেওয়া—দুই বিভাগেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন এই তরুণ। শ্রীলংকার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে চাপের মুখে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে পাকিস্তানকে শিরোপা জিতিয়েছেন তিনি। শুধু ফাইনালের নায়ক হওয়াই নয়, পুরো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছেন সিরিজসেরার পুরস্কারও।
মাত্র ২১ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন পরিণত পারফরম্যান্সে ক্রিকেটবিশ্বের নজর কেড়েছেন বাঁহাতি স্পিনার ও ব্যাটিং অলরাউন্ডার মিনহাস। তাঁর সাম্প্রতিক সাফল্য পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট পরিকল্পনায় নতুন সম্ভাবনার কথাও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফাইনালে কঠিন পরিস্থিতি থেকে পাকিস্তানকে শিরোপা উপহার
শনিবার (৩১ অক্টোবর) লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলংকার মুখোমুখি হয় পাকিস্তান। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাঁচ উইকেট হারানোর পরও জয়ের জন্য ৭৯ বলে ১২৫ রান প্রয়োজন ছিল স্বাগতিকদের। একের পর এক উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল পাকিস্তান শিবিরে।
ঠিক সেই সময় ক্রিজে আসেন আরাফাত মিনহাস। হাসান নেওয়াজকে সঙ্গে নিয়ে দলের হাল ধরেন তিনি। পরিস্থিতি ছিল কঠিন, কিন্তু তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল না কোনো অস্থিরতা। বরং সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকেন এই তরুণ।
ম্যাচের একপর্যায়ে ২৭ বলে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৩৯ রান। শ্রীলংকার অধিনায়ক দাসুন শানাকার করা একটি লেংথ বল মিডউইকেট দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে ছক্কা হাঁকান মিনহাস। তাঁর এই শট ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমে ফিরে আসে জয়ের আত্মবিশ্বাস।
এরপর আরও চারটি ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩১ বলে ৬১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে পাকিস্তানের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মিনহাস।
ফাইনালের এই ইনিংস ছিল তাঁর পুরো টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্সেরই প্রতিফলন। সিরিজজুড়ে বল হাতে ৯ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতে করেছেন ১৪৯ রান। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে দুটি অর্ধশতক। ব্যাটিং ও বোলিংয়ে এমন ধারাবাহিকতার সুবাদে সিরিজসেরার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে নিজের ব্যাটিং পরিকল্পনা সম্পর্কে আরাফাত জানান, চাপের পরিস্থিতি তিনি উপভোগ করেন। কঠিন সময়ে শান্ত থাকা এবং জয়ের সম্ভাবনায় বিশ্বাস ধরে রাখাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দলের এমন একজন খেলোয়াড় প্রয়োজন, যিনি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও দেখিয়েছেন বিধ্বংসী অলরাউন্ড নৈপুণ্য
শ্রীলংকার বিপক্ষে ফাইনালের আগে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও নিজের সামর্থ্যের অসাধারণ প্রমাণ দিয়েছিলেন আরাফাত। গত ১০ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে ম্যাচে ব্যাট হাতে ৫৮ বলে ৫৯ রান করেন তিনি।
সেদিন পাকিস্তানের অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। মাত্র ৮১ রানে চার উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দল। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটিংয়ে নেমে দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন মিনহাস। তাঁর অবদানে শেষ পর্যন্ত ৩০২ রানের লড়াকু সংগ্রহ দাঁড় করায় পাকিস্তান।
ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও নিজের সামর্থ্য দেখান এই বাঁহাতি স্পিনার। মাত্র ৪০ রান খরচায় তুলে নেন ছয় উইকেট। তাঁর ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়ে পড়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। শেষ পর্যন্ত ২১৫ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীদের ইনিংস। পাকিস্তান জয় পায় ৮৭ রানের বড় ব্যবধানে।
একসময় কোনো উইকেট না হারিয়েই ৯১ রান তুলে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। সেখান থেকে মিনহাসের স্পিন আক্রমণে দ্রুত ভেঙে পড়ে তাদের ব্যাটিং। ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকও তাঁর বলে পরাস্ত হন। মাত্র পাঁচ রান করে বোল্ড হয়ে ফিরে যেতে হয় তাঁকে। আরাফাতের বয়স নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে ম্যাচের পর ব্রুক জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর বয়স সত্যিই কি ২১ বছরের নিচে!
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্লেষক নাসের হুসেইনও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন পাকিস্তানের এই তরুণকে। ধারাভাষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, একটি অর্ধশতক, ছয় উইকেট এবং একটি রানআউট—সব মিলিয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন মিনহাস। পাকিস্তানের প্রধান কোচ মাইক হেসন যে ধরনের কার্যকর অলরাউন্ডার খুঁজছেন, আরাফাত সেই প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনাময় একজন ক্রিকেটার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ওয়ানডেতে অর্ধশতক করার পাশাপাশি পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন মিনহাস। পাকিস্তানের হয়ে এর আগে এই বিরল কীর্তি গড়েছিলেন শহীদ আফ্রিদি ও আবদুল রাজ্জাক। তাঁদের পর তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এই তালিকায় নাম লেখান তিনি।
ওয়ানডে অভিষেকেই পাঁচ উইকেট
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরাফাতের উত্থান অবশ্য এক ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। এর আগেই গত মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে নজর কাড়েন তিনি। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচেই ৩২ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট তুলে নেন এই তরুণ স্পিনার।
অভিষেক ওয়ানডেতে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম পাকিস্তানি বোলার হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। সেই সিরিজেও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন মিনহাস। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরু থেকেই নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে আসছেন এই অলরাউন্ডার।
পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার হওয়ার স্বপ্ন
নিজেকে শুধু ব্যাটিং অলরাউন্ডার কিংবা বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত করতে চান না আরাফাত। তাঁর লক্ষ্য একজন পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার হয়ে ওঠা। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের এই ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
একজন ক্রিকেটারের কাছে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই দলের প্রয়োজনে অবদান রাখার সামর্থ্য থাকা জরুরি বলে মনে করেন মিনহাস। তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সেও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাট হাতে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি বল হাতে উইকেট নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
তবে এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে তাঁর বাবা কাশিফ মিনহাসের বড় অবদান। ছোটবেলায় আরাফাতের স্বপ্ন ছিল একজন দ্রুতগতির বোলার হওয়ার। কিন্তু আট বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে চামড়ার বল পাওয়ার পর তাঁর ক্রিকেটীয় জীবনে পরিবর্তন আসে। বাবার পরামর্শে বাঁহাতি স্পিন বোলিং শুরু করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সেই স্পিনই হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম প্রধান অস্ত্র।
কাশিফ নিজেও একসময় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। মুলতানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব পালনের জন্য বাবার নির্দেশে ক্রিকেট ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাঁকে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে শুরু করেন সন্তানদের মধ্যে।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাশিফ জানিয়েছিলেন, ছোটবেলায় ছেলেদের খেলাধুলা দেখে তাঁদের মধ্যে বিশেষ প্রতিভার উপস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন। এরপর থেকেই তাঁদের পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। প্রয়োজনীয় ক্রিকেট সরঞ্জাম কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে নিয়মিত অনুশীলনের ব্যবস্থা—সবকিছুতেই ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা।
আরাফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, আট-নয় বছর বয়স থেকেই শক্ত বল দিয়ে বাঁহাতি স্পিন করতেন তিনি। তবে টেপ-টেনিস ক্রিকেট খেলার সময় পেস বোলিংও করেছেন। শৈশবের সেই অনুশীলনই পরবর্তী সময়ে তাঁর ক্রিকেটীয় দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বাড়ির ছাদে অনুশীলন থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে দ্রুত নিজের অবস্থান তৈরি করেন আরাফাত। অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ে দেশের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ার পর জায়গা করে নেন পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ধাপে ধাপে নিজেকে প্রমাণ করে এগিয়ে যান জাতীয় দলের পথে।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনুশীলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতেও ছেলেদের প্রস্তুতি থামতে দেননি কাশিফ মিনহাস। মুলতানে নিজের বাড়ির ছাদে তৈরি করেন অনুশীলনের উপযোগী পরিবেশ। সেখানে স্থাপন করা হয় নেট, ম্যাট পিচ ও ফ্লাডলাইট। ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পায় তাঁর সন্তানেরা।
২০২৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও পাকিস্তানের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন আরাফাত। তাঁর পারফরম্যান্সে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায় দল। তবে শেষ চারের লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছে মাত্র এক উইকেটে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় পাকিস্তানকে।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্যের পর জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া ছিল তাঁর জন্য বড় অর্জন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ক্রিকেটপ্রেমী পরিবারে আরেক প্রতিভা সামির
আরাফাতের ক্রিকেটীয় যাত্রায় পরিবারের অন্য সদস্যদেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁর ছোট ভাই সামির মিনহাসও একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটার। ডানহাতি এই ওপেনিং ব্যাটার শ্রীলংকার বিপক্ষে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য পাকিস্তান দলে সুযোগ পেয়েছেন।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক মৌসুমেই সাত ম্যাচে ৪০৫ রান করেছেন সামির। পাশাপাশি পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য আবদুল্লাহও ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত। বাঁহাতি ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি লেগ স্পিন করেন তিনি।
একই পরিবারের তিন সন্তানের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ এবং পেশাদার পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা পাকিস্তানের ক্রিকেটাঙ্গনে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে।
আরাফাত মিনহাসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের শক্তিশালী ব্যাটারদের বিপক্ষে বোলিং করা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে দলের দায়িত্ব নেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে আরও পরীক্ষা দিতে হবে। তবে অল্প বয়সে যে পরিণতিবোধ, আত্মবিশ্বাস ও অলরাউন্ড দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে পাকিস্তান ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।


