আজ তাঁর অভিনীত সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহের সামনে ভিড় করেন হাজারো দর্শক। তাঁর নামেই সিনেমা হলে তৈরি হয় উন্মাদনা। অথচ ছোটবেলায় একবার বাবার হাত ধরে সিনেমা দেখতে গিয়েও প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করতে পারেননি শাহরুখ খান। কারণ, ছেলের সিনেমা দেখার ইচ্ছা পূরণ করার মতো টাকা সেদিন তাঁর বাবার পকেটে ছিল না। তবে ছেলের মুখে হাসি ফোটাতে বিকল্প এক আনন্দের ব্যবস্থা করেছিলেন বাবা তাজ মোহাম্মদ খান। জীবনের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্মৃতি আজও আবেগাপ্লুত করে বলিউডের এই সুপারস্টারকে।
২ নভেম্বর শাহরুখ খানের জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে তাঁর অভিনয়জীবন, সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফিরে আসে ব্যক্তিগত জীবনের নানা স্মৃতি। এর মধ্যে বাবার সঙ্গে কাটানো সিনেমা দেখতে যাওয়ার সেই দিনটি অন্যতম। ছোট্ট একটি ঘটনা হলেও শাহরুখের জীবনে এর গুরুত্ব অনেক। কারণ, সেই দিনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাবার ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাকে আনন্দে রাখার চেষ্টা।
২০১২ সালে একটি অনুষ্ঠানে নিজের শৈশবের এই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন শাহরুখ। তিনি বলেছিলেন, দিল্লির কমানি অডিটোরিয়ামের কাছে বাবার হাত ধরে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। সিনেমা দেখার আনন্দে তখন বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন ছোট্ট শাহরুখ। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছানোর পর জানা যায়, টিকিট কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা তাঁর বাবার কাছে নেই। ফলে সিনেমা দেখা আর হয়ে ওঠেনি।
সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে কোনো শিশুর মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তাজ মোহাম্মদ খান ছেলেকে হতাশ হতে দেননি। সিনেমা দেখাতে না পারলেও অন্যভাবে তাঁর মন ভালো করার চেষ্টা করেন। প্রেক্ষাগৃহের বাইরে বসে ছেলেকে রাস্তার দিকে তাকাতে বলেন। গাড়িগুলো কী সুন্দরভাবে চলাচল করছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে বলেন তিনি। এরপর ছোট্ট শাহরুখ বাবার সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা দিয়ে চলাচল করা গাড়ি দেখতে থাকেন। সিনেমা দেখা না হলেও বাবার সঙ্গে সেই সময়টুকু তাঁর কাছে আনন্দের হয়ে উঠেছিল।
বহু বছর পর নিজের ছেলে আরিয়ান খানকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে গিয়ে সেই স্মৃতি আবার মনে পড়ে শাহরুখের। জীবনের পথচলায় তখন তিনি অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। একসময় যে শিশুকে টিকিটের অভাবে সিনেমা হলের বাইরে বসে থাকতে হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই তিনিই নিজের সন্তানকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। জীবনের এই পরিবর্তন তাঁর কাছে নিছক একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি ছিল না; বরং বাবার সঙ্গে কাটানো শৈশবের একটি বিশেষ মুহূর্ত নতুন করে অনুভব করার উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল।
শাহরুখের জীবনে বাবার প্রভাব ছিল গভীর। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বাবা তাজ মোহাম্মদ খানকে হারান তিনি। এর কয়েক বছর পর, ১৯৯০ সালে মাকেও হারাতে হয় তাঁকে। অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারানোর শোক সামলে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই অভিনেতাকে। আর্থিক অনটনসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি।
বাবাকে নিয়ে শাহরুখের একটি মন্তব্য তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পরিচয় দেয়। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ব্যর্থ মানুষ এবং আমি তাঁকে নিয়ে গর্বিত।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাবার জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আজ শাহরুখ খান শুধু বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতাই নন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত একটি নাম। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য সাফল্য, পুরস্কার ও দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি। তাঁর অভিনীত সিনেমা ঘিরে তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। কিন্তু তারকাখ্যাতি কিংবা জীবনের সাফল্য শৈশবের সেই দিনটিকে মুছে দিতে পারেনি।
বাবার সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়ে প্রেক্ষাগৃহে ঢুকতে না পারার ঘটনাটি হয়তো অন্য কারও কাছে খুব সাধারণ একটি স্মৃতি। কিন্তু শাহরুখের কাছে সেটি হয়ে আছে ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ। সেদিন সিনেমার পর্দায় কোনো গল্প দেখা হয়নি তাঁর, তবে বাবার কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছিল, সেটিই হয়ে উঠেছে আজীবনের স্মৃতি।



